সোমবার

২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৮ কার্তিক, ১৪৩৩

এইচএসসিতে অকৃতকার্যরা পাস করলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা

কুবি,প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২ নভেম্বর, ২০২৬ ০৯:২৩

শেয়ার

এইচএসসিতে অকৃতকার্যরা পাস করলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
ছবি: বাংলা এডিশন

এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা সম্পূরক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করার সুযোগ হারাতে পারেন। ইতোমধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি আবেদনের সময়সূচি প্রকাশ করেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন শেষ হবে আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে। অথচ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সম্পূরক (সাপ্লিমেন্টারি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর।

ফলে আবেদন শেষ হওয়ার পর সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে এসব শিক্ষার্থীর আবেদন করার সুযোগ থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত জিপিএর শর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে সম্পূরক পরীক্ষায় পাস করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী চলতি শিক্ষাবর্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শনিবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা ২০০৪ সালের পর সর্বনিম্ন।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। এর মধ্যে এক বিষয়ে অকৃতকার্য ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন।

এসব শিক্ষার্থীর জন্য আগামী ২ ডিসেম্বর থেকে সম্পূরক পরীক্ষা গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ আগামী ৩১ ডিসেম্বর।

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু স্বাক্ষরিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর থেকে সম্পূরক পরীক্ষার ফরম পূরণ শুরু হয়ে চলবে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত। ১ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ চলবে। তবে বিদ্যমান বিধিমালায় এ ধরনের পরীক্ষা গ্রহণের সুযোগ না থাকায় সম্পূরক পরীক্ষা আয়োজনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লিখিত নির্দেশনা প্রয়োজন।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত জিপিএ অর্জন করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে দুই পরীক্ষার মোট জিপিএ এবং পৃথক পরীক্ষার জিপিএর শর্তও ভিন্ন। ফলে এইচএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা সম্পূরক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফল না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ করতে পারছেন না।

কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন শেষ হবে ফল প্রকাশের আগেই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তির আবেদন শুরু হবে ১১ নভেম্বর। আবেদন চলবে ২৫ নভেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। অন্যদিকে, সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ৩১ ডিসেম্বর। অর্থাৎ আবেদন শেষ হওয়ার ৩৬ দিন পর ফল প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ৫ ডিসেম্বর। ওই দিন আইবিএ ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১২ ডিসেম্বর বিজ্ঞান ইউনিট, ১৯ ডিসেম্বর কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট, ২২ ডিসেম্বর চারুকলা ইউনিট এবং ২৬ ডিসেম্বর ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক আবেদন শুরু হবে ১২ নভেম্বর এবং শেষ হবে ২৭ নভেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ৮, ৯ ও ১৬ জানুয়ারি। অর্থাৎ সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই প্রাথমিক আবেদনের সময় শেষ হয়ে যাবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে আবেদন শুরু হবে ১৫ নভেম্বর। আবেদন চলবে ১০ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। একইভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ২০২৭ সালের ২৯ জানুয়ারি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও ১৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে হলেও আবেদনের সময় শেষ হবে সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশের ২১ দিন আগে।

পরীক্ষা দেরিতে হলেও আবেদনের সময় এখনো অনিশ্চিত

অন্যদিকে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও এখনো আবেদনের সময়সূচি প্রকাশিত হয়নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ১০ জানুয়ারি, চলবে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা ১৬ জানুয়ারি এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সম্ভাব্য পরীক্ষার তারিখ ১৪ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের সময়সূচি ও বিস্তারিত ভর্তি বিজ্ঞপ্তি এখনো প্রকাশিত হয়নি।

এ ছাড়া কৃষি গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ২ জানুয়ারি। সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জিএসটি) গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১৯, ২০ ও ২৭ মার্চ। কৃষি গুচ্ছ ও জিএসটি গুচ্ছের আবেদন শুরুর ও শেষের তারিখও এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৮ জানুয়ারি। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিস্তারিত আবেদনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে।

ফলে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের সময়সীমা সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই শেষ হচ্ছে, সেগুলোতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের চলতি শিক্ষাবর্ষে আবেদনের সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন প্রক্রিয়া এখনো ঘোষণা করা হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ফল প্রকাশের পর আবেদনের সুযোগ রাখা হবে কি না, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর।

এ অবস্থায় সম্পূরক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হারানোর আশঙ্কা করছেন অনেক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাঁদের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া এবং আবেদনের সময় পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন, সম্পূরক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি কার্যক্রমের সমন্বয় করা হবে কি না। অন্যথায় পরীক্ষায় পাস করেও শুধু ভর্তি আবেদনের সময়সূচির কারণে একটি শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন যোগ্য শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য এইচএসসি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, ‘তাদের বিষয়ে সরকার ঘোষণা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে আমরা বসব। এরপর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, বিষয়টি একটি নতুন পদ্ধতি। তাই এটি কীভাবে প্রচলিত ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে ভর্তি কমিটিতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি ভর্তি কমিটি রয়েছে। কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে মূল ধারায় ফিরে আসার যে সুযোগ পাচ্ছে, সেটিও দেশের শিক্ষা খাতে নতুন একটি সংযোজন। এসব বিষয় কীভাবে আমাদের ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে ভর্তি কমিটির সভায়।’



আরও পড়ুন: