শুক্রবার

৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫ কার্তিক, ১৪৩৩

অভাবের সংসার পেরিয়ে ব্যাডমিন্টনে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন যবিপ্রবির লিকা পোদ্দার

আল আমিন,যবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৫৬

শেয়ার

অভাবের সংসার পেরিয়ে ব্যাডমিন্টনে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন যবিপ্রবির লিকা পোদ্দার
ছবি: সংগৃহীত

নদীতে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালান বাবা। সেই পরিবারের মেয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার এখন জাতীয় ব্যাডমিন্টনের চ্যাম্পিয়ন। দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছরের সাধনা আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে শিরোপা জিতেছেন তিনি। জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপা জয়ের পর মোংলায় থাকা মাকে ভিডিও কল করেন লিকা। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আনন্দে কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি, কেঁদে ফেলেন তিনি।

নারী এককের ফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উর্মি আক্তারকে হারিয়ে শিরোপা জেতেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে খেলা ২৪ বছর বয়সী লিকা। টানটান উত্তেজনার ম্যাচে তিনি উর্মিকে হারান ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে। পাঁচ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এই শাটলার।

তবে লিকার এই সাফল্য কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পরিবারের সংগ্রাম, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের অদম্য চেষ্টা। মোংলায় বেড়ে ওঠা লিকার বাবা পেশায় মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে চলে চার সদস্যের সংসার। এমন বাস্তবতায় খেলাধুলায় ক্যারিয়ার গড়ে তোলা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তবু নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনুশীলন চালিয়ে গেছেন তিনি।

লিকার ব্যাডমিন্টন-যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে মোংলায়। প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের অধীনে একটি পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তৈরি কোর্টে তিন থেকে চার বছর অনুশীলন করেন তিনি। পরে তাঁকে দিনাজপুরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য নেয়া হয়। সেখানকার অভিজ্ঞতা তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া এলোরা শাটলিন অ্যাকাডেমি, কাওসাকি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ এবং কোচের সহযোগিতা তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথে সহায়ক হয়েছে।

জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি জানিয়ে লিকা বলেন, আমার এই যাত্রা অনেক দিনের। গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে খেলছি। শুরু থেকেই আমার একটা লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। অবশেষে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের ও গর্বের।

এবারের প্রতিযোগিতায় ছেলেদের বিভাগে ৫১২ জন এবং মেয়েদের বিভাগে ৮৩ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। নকআউট পদ্ধতিতে একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছানো এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা অর্জন করাকে নিজের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন লিকা।

পড়াশোনা ও খেলাধুলা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়াও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা এবং নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয় তাঁকে। লিকার মতে, গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের খেলাধুলায় এগিয়ে যাওয়ার পথে সামাজিক বাধাও রয়েছে। অনেক সময় খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারকেও এলাকার মানুষের নানা মন্তব্য শুনতে হয়। তবে তাঁর পরিবার সব সময় পাশে ছিল। মেয়েকে দেশের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখার স্বপ্ন মা-বাবারও ছিল। তাঁদের সমর্থন তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

নিজের সাফল্যের পেছনে প্রথম কোচের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন লিকা। তাঁর ভাষ্য, মিলন সর্দার জুস সব সময় চেষ্টা করেছেন, যাতে তিনি ভালো করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান। পরিবারের সমর্থন, কোচের দিকনির্দেশনা ও নিজের পরিশ্রমের সমন্বয়েই দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।

যবিপ্রবির ক্রীড়াসুবিধা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিকা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলা ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে ভালো অবস্থানে থাকতে নিয়মিত অনুশীলন এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কোচের সংকট অনুভব করেন তিনি। কাফি স্যারের বাইরে আরও ভালো কোচের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন এই খেলোয়াড়।

জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ সামলাতে হয়। ফলে অনেক সময় দুটি দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। খেলোয়াড়দের বাস্তবতা বিবেচনায় উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা থাকলে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে বলে মনে করেন লিকা।

নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, সাফল্যের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা, নিয়মিত অনুশীলন করা, কোচের নির্দেশনা মেনে চলা এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকা জরুরি। এক দিনে ভালো ফল পাওয়া যায় না, এর জন্য সময়, ধৈর্য ও পরিশ্রম প্রয়োজন। তাঁর মতে, খেলাধুলার মাধ্যমে পরিচিতি ও সম্মান অর্জনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তাই যারা খেলাধুলায় আসতে চান, তাঁদের আন্তরিকতা নিয়ে শুরু করে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

লিকার এই সাফল্যে গর্বিত যবিপ্রবি প্রশাসনও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা দপ্তরের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. অভিনু কিবরিয়া বলেন, লিকা পোদ্দারের এই সাফল্যে আমরা অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা চালিয়ে এসে তার চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমরা আশাবাদী, ভবিষ্যতেও সে আরও সাফল্য অর্জন করবে। তার জন্য আমাদের আন্তরিক শুভকামনা রইল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কে তিনি বলেন, সম্প্রতি ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় শিক্ষার্থীরা ভালো পারফরম্যান্স করছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ও কোচদের প্রচেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠার ফলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়েরা ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারছেন।

তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও স্বীকার করেন ড. অভিনু কিবরিয়া। তাঁর ভাষ্য, সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষার্থীদের ভালো করার জন্য তাঁদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। ভবিষ্যতে খেলাধুলায় আরও ভালো ফল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাফল্য বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

জাতীয় শিরোপা জয়ের পর লিকার লক্ষ্য এখন সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা। নদীতে মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার মেয়ের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, দীর্ঘদিনের পারিবারিক সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়েরও স্বীকৃতি। মোংলার একটি পুরোনো কোর্টে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা আজ জাতীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুটে পৌঁছেছে। এবার তাঁর স্বপ্ন আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টনের মঞ্চে দেশের পতাকা উঁচু করে ধরা।