বৃহস্পতিবার

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪ কার্তিক, ১৪৩৩

স্ট্রোকের পর নতুন জীবনের স্বপ্নঃ পুনর্বাসনে আশার আলো দেখাচ্ছে যবিপ্রবির ফিজিওথেরাপি

আল আমিন,যবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৫

শেয়ার

স্ট্রোকের পর নতুন জীবনের স্বপ্নঃ পুনর্বাসনে আশার আলো দেখাচ্ছে যবিপ্রবির ফিজিওথেরাপি
ছবি: সংগৃহীত

২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোকের ঝুঁকি ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। স্ট্রোক মুহূর্তেই একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে। তবে দ্রুত চিকিৎসা, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও যথাযথ পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক রোগীর পক্ষেই দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ নতুন করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। একই বছরে এ রোগে মৃত্যু হয় প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার মানুষের। বয়স বাড়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়লেও যেকোনো বয়সেই এ রোগ হতে পারে। তাই ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া কিংবা হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে আসাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। এগুলো স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। চিকিৎসকেরা দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করতে ‘বিই ফাস্ট’ (BE FAST) পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেন। এ পদ্ধতিতে হঠাৎ ভারসাম্য হারানো (Balance), দৃষ্টিতে সমস্যা (Eyes), মুখ বেঁকে যাওয়া (Face), হাত দুর্বল হয়ে পড়া (Arms), কথা জড়িয়ে যাওয়া (Speech) এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার (Time) বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এসব লক্ষণের যেকোনোটি দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া রোগীকে খাবার বা ওষুধ খাওয়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।

বাংলাদেশে স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনসেবার সীমাবদ্ধতা রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষায়িত পুনর্বাসনকেন্দ্রের স্বল্পতা এবং জেলা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য থেরাপির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হয়। প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনসেবা না পাওয়ায় তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে যশোরের পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. রফিকুল ইসলামকে। বছরখানেক আগে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর শরীরের ডান পাশ পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রাণে বাঁচলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। রফিকুল ইসলাম বলেন, স্ট্রোকের পর যখন ডান হাত-পা একদম কাজ করছিল না, তখন মনে হতো জীবনটা এখানেই শেষ। ঠিকমতো দাঁড়াতে পারতাম না, অন্যের সাহায্য ছাড়া এক পাও নড়ার উপায় ছিল না। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নেওয়া শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার অবশ অঙ্গগুলো কাজ করতে শুরু করে। আজ আমি কারও সাহায্য ছাড়াই, লাঠি ছাড়া হেঁটে চলতে পারছি, যা কিছুদিন আগেও অসম্ভব মনে হতো।

স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসন ও ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব তুলে ধরে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের শিক্ষক ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক ডা. আহমাদুল্লাহিল গালিব বলেন, অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে স্ট্রোকের পর রোগীর জীবন বাঁচলেই বুঝি সব শেষ। অথচ স্ট্রোকের আসল লড়াই শুরু হয় এর পরে। মস্তিষ্কের যে অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাকে রি-ট্রেনিং বা পুনর্গঠন করতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই। আমাদের দেশে রিহ্যাব সেন্টারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। যদি প্রতিটি অঞ্চলে স্ট্রোক পুনর্বাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকত, তবে লাখ লাখ মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ততার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারত।

দেশে স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনসেবার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় যবিপ্রবির ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভাগটিতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনসেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতেও কাজ করছে বিভাগটি। একই সঙ্গে স্ট্রোক পুনর্বাসন বিষয়ে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে।

২০২৩ সালে বিভাগটির উদ্যোগে স্ট্রোক পুনর্বাসনবিষয়ক তিন দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উপলক্ষে স্ট্রোক প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোক মোকাবিলায় প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা এবং যথাযথ পুনর্বাসন তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের পর জীবন থেমে যায় না, বরং সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তাই পরিবারের কারও মধ্যে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। কারণ স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ।