দেশের চার উপকূলীয় এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ছয় প্রজাতির মাছের শুঁটকির সব নমুনায় নয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল গবেষক। ২৪টি নমুনা পরীক্ষা করে তাঁরা সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন কুয়াকাটার শুঁটকিতে। এরপর রয়েছে কক্সবাজার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় সহযোগী হিসেবে ছিলেন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া ও সানজিদা জুঁথি।
চার এলাকার ছয় প্রজাতির শুঁটকি পরীক্ষা
গবেষণার জন্য সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। শুঁটকি হিসেবে বহুল ব্যবহৃত লইট্টা, পোয়া, ছুরি, ফাইস্যা, হরিণা চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ি থেকে ছয়টি প্রজাতি বেছে নিয়ে মোট ২৪টি নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকেরা জানান, পরীক্ষিত প্রতিটি নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স অনুযায়ী, কুয়াকাটার শুঁটকিতে সূচকের মান ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭ এবং কক্সবাজারের শুঁটকিতে ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১।
শনাক্ত হওয়া নয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিস্টাইরিন (পিএস) সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে।
শুঁটকিতে প্লাস্টিক প্রবেশের কারণ নিয়ে উদ্বেগ
গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খান বলেন, ব্যবসায়ীরা মাছের লার্ভার আক্রমণ ও অপচয় রোধে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ডিডিটির মতো রাসায়নিকও রয়েছে। ফলে শুঁটকিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিকও প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তিনি জানান, অতীতে শুঁটকিতে লার্ভার আক্রমণ ও অপচয় ঠেকাতে ব্যবসায়ীরা ডিডিটি ও নগভসের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করতেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পরবর্তী সময়ে খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা বাড়লে বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকিতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি।
অধ্যাপক আশরাফুল আজম খানের মতে, দেশে ব্যাপকভাবে শুঁটকি উৎপাদিত হলেও তা মানসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পৌরসভা, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন বর্জ্য উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে প্লাস্টিক কণায় পরিণত হচ্ছে। এসব দূষিত উপকূলীয় এলাকার মাছ থেকে তৈরি শুঁটকিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও কঠোর নজরদারির দাবি
শুঁটকি উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খান। তিনি বলেন, খোলা মাঠে শুঁটকি না শুকিয়ে সোলার ড্রায়ার, ছাদযুক্ত স্থান কিংবা নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে শুঁটকি প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত প্লাস্টিক শিট, সিন্থেটিক দড়ি ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে যাতে প্লাস্টিক কণা মাছের সঙ্গে মিশতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির পরামর্শ দেন তিনি।
পাশাপাশি দৈনন্দিন প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং উপকূলীয় এলাকায় পৌর ও শিল্পবর্জ্যের যথাযথ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এই গবেষক। তাঁর মতে, ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবে কঠোর নজরদারি ও নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে মানবস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, গবেষণাটি গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী মেরিন পলিউশন বুলেটিনে অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। এলসেভিয়ার প্রকাশিত সাময়িকীটিতে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সামুদ্রিক দূষণবিষয়ক গবেষণা প্রকাশ করা হয়।
আরও পড়ুন:







