রবিবার

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০ কার্তিক, ১৪৩৩

দাঁড়িপাল্লার ছবি বদলাতে ফেরত নেওয়া হচ্ছে ৩০ লাখ বই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৩৪

শেয়ার

দাঁড়িপাল্লার ছবি বদলাতে ফেরত নেওয়া হচ্ছে ৩০ লাখ বই
ছবি সংগৃহীত

আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের বিতর্কের মুখে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো ২০ থেকে ৩০ লাখ বই ফেরত নিয়ে দাঁড়িপাল্লার বদলে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করে পুনর্মুদ্রণ করা হবে। এতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রতিটি বই ছাপাতে বর্তমানে খরচ হয় ৫৭ টাকা। গত বৃহস্পতিবার রাতে বইটির মুদ্রণ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে ছাপা হচ্ছে ২২ কোটির বেশি বই। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার। সব মিলিয়ে বই ছাপার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে ৭৬ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ বই। প্রাথমিকের বই ছাপা শুরুর প্রায় এক মাস পর মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ শুরু হয়।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আনছে এনসিটিবি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি নিবন্ধ যুক্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-সম্পর্কিত বর্ণনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত বই এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা তিন ধরনের রূপ পাচ্ছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি হলো বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও খেলাধুলা। ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি হলো আমার কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রবিবার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভা ডাকা হয়েছে। ওই সভায় অনুমোদন পেলে চারটি নতুন বইয়ের ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হবে।

একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের ঘটনায় বই প্রণয়নপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এনসিটিবির দাবি, ২০২৫ সালের বইয়ের পুরোনো নকশাটি ভুলক্রমে পুনরায় যুক্ত হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, ঘটনাটিকে নিছক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহার করে কোনো আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা শিক্ষার বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষুণ্ন করে। প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

ফেরত নেওয়া বই সংশোধনের উদ্যোগ

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মুদ্রণকাজ কয়েক দিন আগে শেষ হয়েছে। বইগুলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও পাঠানো হয়েছে। নকশায় ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর গত শুক্রবারের অনলাইন সভায় বইগুলো ফিরিয়ে সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়।

এনসিটিবির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে পাঠানো বই ফেরত আনতে জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনলাইন সভা হয়েছে। বইগুলো সংগ্রহ করে সংশোধনের পর আবার পাঠানো হবে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বই সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

এনসিটিবির আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ভুল তথ্য না পায়, তা নিশ্চিত করতে তাঁরা কাজ করছেন।

বাড়তি ব্যয় ও সময়ের চাপ

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বই ছাপানো হচ্ছে প্রায় ৩৮ লাখ কপি। এর বেশির ভাগের মুদ্রণকাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ বই ছাপা শেষে মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক সদস্য জানিয়েছেন। এসব বই ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে।

বই ফেরত আনা, সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও লাগবে। অথচ চলতি বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে সব বই পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের।

মুদ্রণ মালিকদের ভাষ্য, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের কাজ আগেই শেষ হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে অন্তত ৩০ লাখ বই পাঠানো হয়েছে।

দাঁড়িপাল্লার ছবি আগেও পরিবর্তন করা হয়েছিল

ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের উপাত্ত ও তথ্য অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তর হিসেবে উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেখানো হয়েছে। এতে প্রথম স্তরে বৃত্তাকার প্রতীক, দ্বিতীয় স্তরে পরমাণু বা নেটওয়ার্কসদৃশ চিত্র, তৃতীয় স্তরে মস্তিষ্ক এবং সর্বোচ্চ স্তর প্রজ্ঞায় দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়।

২০২৫ সালের বইয়ে থাকা দাঁড়িপাল্লার ছবিটি ২০২৬ সালের সংস্করণে পরিবর্তন করে মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৭ সালের নকশায় পুরোনো ছবিটি আবার ফিরে আসে। দাঁড়িপাল্লা একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক হওয়ায় এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এনসিটিবি এখন প্রজ্ঞা শব্দটি অপরিবর্তিত রেখে দাঁড়িপাল্লার বদলে মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধিত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়াই এখন সংস্থাটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।