সোমবার

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪ কার্তিক, ১৪৩৩

টাকার বিনিময়ে এমফিল-পিএইচডি, অনুমোদনহীন স্টাডি সেন্টারে ডিগ্রি বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৬

আপডেট: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৬

শেয়ার

টাকার বিনিময়ে এমফিল-পিএইচডি, অনুমোদনহীন স্টাডি সেন্টারে ডিগ্রি বাণিজ্য
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

উচ্চশিক্ষার সম্মানজনক ডিগ্রি এমফিল ও পিএইচডি অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে রাজধানীতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অনুমোদনহীন স্টাডি সেন্টার। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাচেলর, মাস্টার্স, এমবিএ, এলএলবি থেকে শুরু করে এমফিল ও পিএইচডি পর্যন্ত নানা ডিগ্রি ও কোর্সের কার্যক্রম চলছে। তবে এসব স্টাডি সেন্টারের কোনোটিকেই দেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সংস্থাটির কাছে এমন ১৭টি প্রতিষ্ঠান ও স্টাডি সেন্টারের তালিকা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। বিদেশি ডিগ্রি অর্জনের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে পরিচালিত এসব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডিগ্রির স্বীকৃতি, শিক্ষার মান, ভর্তি প্রক্রিয়া, পাঠদান এবং সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশে এসব ডিগ্রির সমতা বিধানের সুযোগ নেই বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে অননুমোদিত স্টাডি সেন্টারগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে ইউজিসি। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টারসংক্রান্ত বিধিমালা যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। নতুন বিধিমালা প্রণয়নের পর অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, অনুমোদনহীন এসব স্টাডি সেন্টার এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার অনুমোদনের জন্য ২০১৪ সালে একটি বিধিমালা জারি করা হয়েছিল। তবে সেটি বর্তমান সময়ের উপযোগী নয়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নতুন বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানের নাম বেশি

ইউজিসির তালিকায় বাংলাদেশে পরিচালিত স্টাডি সেন্টার বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকলেও ইউজিসির অনুমোদন নেই। অথচ কোর্সের পাঠ্যক্রম, শিক্ষাপদ্ধতিসহ শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব ইউজিসির। প্রতিষ্ঠানটির নাম সংস্থাটির ওয়েবসাইটেও নেই।

তালিকায় থাকা অনুমোদনহীন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ভূঁইয়া একাডেমি, ব্যাক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, নিউক্যাসল ল একাডেমি, নিউক্যাসল ল একাডেমি ওয়েস্ট, কেমব্রিজ বিজনেস অ্যান্ড ল একাডেমি, ব্রিটিশ স্কুল অব ল, লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ (সাউথ), লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ (নর্থ), লিংকনস হায়ার এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট, লন্ডন স্কুল অব কমার্স ঢাকা, এডুক্যান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কিংস্টন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি, স্পিরিচুয়াল ইনস্টিটিউট অব নিউইয়র্ক এবং ঢাকা সেন্টার ফর ল অ্যান্ড ইকোনমিকস।

এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানই বেশি। তালিকায় রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ার, ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার, লিডস ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডার্বি, লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড ব্রিস্টল, নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস, রেক্সহ্যাম গ্লিন্ডউর ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ার, বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লুচেস্টারশায়ার।

এ ছাড়া তালিকায় সুইজারল্যান্ডের এসএমসি ইউনিভার্সিটি এবং মালয়েশিয়ার পুত্রা বিজনেস স্কুলের নাম রয়েছে। তবে তালিকায় বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এলএলবি থেকে পিএইচডি পর্যন্ত নানা কোর্স

স্টাডি সেন্টারগুলোর তালিকাভুক্ত কোর্সের মধ্যে রয়েছে এলএলবি, এলএলএম, বিবিএ, এমবিএ, বিএ, কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি, আইন বিষয়ে ডিপ্লোমা, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, ফ্যাশন, অর্থনীতি ও হিসাববিজ্ঞান। কিছু প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এমফিল, পিএইচডি, ডক্টরাল ও পোস্টডক্টরাল পর্যায়ের ডিগ্রির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ভূঁইয়া একাডেমির সঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নাম উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তালিকাভুক্ত কোর্সের মধ্যে এলএলবি, বিবিএ ও আইন বিষয়ে ডিপ্লোমা রয়েছে। নিউক্যাসল ল একাডেমির তালিকায় এলএলবি, এলএলএম ও বার ট্রান্সফার টেস্টের উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে লন্ডন স্কুল অব কমার্স ঢাকার তালিকায় বিবিএ, এমবিএ, ডিপ্লোমা, এমফিল ও পিএইচডির কথা বলা হয়েছে। লিংকনস হায়ার এডুকেশন ম্যানেজমেন্টের তালিকায় রয়েছে এমফিল, পিএইচডি, বিবিএ, এমবিএ ও ডিপ্লোমা। কিংস্টন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির তালিকাতেও পিএইচডি, এমবিএ, বিবিএ ও ডিপ্লোমার উল্লেখ রয়েছে।

২০১৪ সালের বিধিমালায় যেসব শর্ত রয়েছে

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার স্থাপন এবং পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালে পৃথক শর্ত নির্ধারণ করে বিধিমালা জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ইউজিসির কাছ থেকে সাময়িক অনুমতিপত্র বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সনদ না নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস কিংবা স্টাডি সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারবে না।

অনুমোদনের আবেদনের সঙ্গে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি ও স্বীকৃতির তথ্য, স্থানীয় উদ্যোক্তা বা প্রতিনিধির পরিচয় ও সাংগঠনিক কাঠামো, প্রস্তাবিত কোর্সের বিস্তারিত পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষকদের তালিকা, যোগ্যতা ও জীবনবৃত্তান্ত, ভবনের মালিকানা বা ভাড়ার দলিল, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রতিনিধির মধ্যে চুক্তি, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং অর্থের উৎসের তথ্য জমা দিতে হয়।

ইউজিসি আবেদন যাচাই করে প্রাথমিক অনুমোদন দিতে পারে অথবা আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে। প্রাথমিক অনুমোদনের পর সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানোর বিধানও রয়েছে।

অবকাঠামো ও শিক্ষকসংক্রান্ত শর্তে স্টাডি সেন্টারের আয়তন কমপক্ষে ১০ হাজার বর্গফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি বিভাগ বা কোর্সের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক, কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের লাইব্রেরি, অন্তত দুই হাজার বই এবং এক কোটি টাকার সংরক্ষিত তহবিল রাখার শর্তও রয়েছে।

ইউজিসির মতে, প্রায় এক যুগ আগে প্রণীত বিধিমালাটি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১০ হাজার বর্গফুট জায়গায় একটি ছোট স্কুল পরিচালনা করাই কঠিন, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্ধের নির্দেশের পরও চলছে কার্যক্রম

চলতি বছরের ৩০ মার্চ অনুমোদনহীন দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার বন্ধের নির্দেশ দেয় ইউজিসি। একই সঙ্গে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে বলা হয়।

সে সময় মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি ছিল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে। তবে ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠান ইউজিসির অনুমোদনের কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি।

তখন ইউজিসির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকার ও ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার ও টিউটরিয়াল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা কমিশনের হাতে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে অনুমোদনহীন এসব স্টাডি সেন্টারের বিরুদ্ধে এখনো সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।