শুক্রবার

১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১ কার্তিক, ১৪৩৩

ডেঙ্গু ঝুঁকির আগাম সংকেত দেবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’

আরিফ জাওয়াদ,ঢাবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৫৩

শেয়ার

ডেঙ্গু ঝুঁকির আগাম সংকেত দেবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’
ছবি; সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কোনো এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি বাড়ছে কি না, তা জানতে এবার কাজে আসতে পারে প্রযুক্তিনির্ভর একটি ফাঁদ। মশার ডানার শব্দের অনুকরণে তৈরি বিশেষ শব্দে আকৃষ্ট হয়ে ফাঁদের কাছে আসবে মশা। ক্যামেরায় তোলা হবে তার ছবি। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করবে মশার প্রজাতি এবং গণনা করবে সংখ্যা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরে বসেই দেখা যাবে এসব তথ্য।

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি শনাক্ত ও বিস্তার পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে ‘MAST-CloudNet’ নামের স্বয়ংক্রিয় ফাঁদটি তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। শব্দ, ক্যামেরা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও এআই প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি যন্ত্রটি মশা জরিপের প্রচলিত পদ্ধতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গবেষকদের আশা, এর মাধ্যমে কোনো এলাকায় এডিস মশার সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপ যৌথভাবে যন্ত্রটি তৈরি করেছে। গবেষণাটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’-এ প্রকাশিত হয়।

কৌশলে মশা ধরার ব্যবস্থা: স্ত্রী এডিস মশা উড়ার সময় তার ডানা থেকে একধরনের শব্দ তৈরি হয়। এই শব্দ শুনে পুরুষ এডিস মশা স্ত্রী মশার দিকে এগিয়ে যায়। গবেষকেরা মশার এই স্বাভাবিক আচরণকে কাজে লাগিয়েছেন ফাঁদ তৈরিতে।

যন্ত্রটি ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে, যা স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দের অনুরূপ। শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ মশা কাছে এলে ফাঁদের ভেতরে থাকা ফ্যান সেগুলোকে টেনে নেয়। পরে হলুদ আঠালো কাগজে আটকে যায় মশাগুলো।

এরপর ফাঁদের ভেতরে থাকা ক্যামেরা মশার ছবি তোলে। ছবিগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে এআই মডেল ছবি বিশ্লেষণ করে মশার প্রজাতি শনাক্ত করে এবং সংখ্যা গণনা করে। এসব তথ্য ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। ফলে প্রতিবার ফাঁদ পরীক্ষা না করেও দূর থেকে মশার উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব।

পুরুষ মশার উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ: মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী মশা, পুরুষ মশা নয়। তবে এডিস মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণে পুরুষ মশার সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পুরুষ মশা স্ত্রী মশার আগে পূর্ণবয়স্ক হয় এবং মশার প্রজননস্থলের কাছাকাছি থাকে। ফলে কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে নতুন করে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে কি না, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এ তথ্য ডেঙ্গুর ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

শব্দযুক্ত ফাঁদে পাঁচ গুণ বেশি মশা: গবেষণাগারে খাঁচার মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, শব্দযুক্ত ফাঁদটি একই ধরনের শব্দহীন ফাঁদের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় টানা তিন দিন যন্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়। ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহলের মধ্যেও ফাঁদটি সচল ছিল। ওই তিন দিনে এতে ৪৯টি এডিস মশা ধরা পড়ে।

গবেষকদের হিসাবে, প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ১২ হাজার টাকা। অন্যদিকে মশা জরিপে ব্যবহৃত সিডিসি লাইট ট্র্যাপের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা। একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার একসঙ্গে অনেকগুলো ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে ফাঁদের সংখ্যা বাড়লে প্রতিটি ফাঁদের তথ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চালু থাকতে পারে যন্ত্রটি।

পরবর্তী পরীক্ষা হবে আবাসিক এলাকায়: গবেষণাগার ও ক্যাম্পাসে পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ফাঁদ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি বাড়ছে, তার একটি আগাম মানচিত্র তৈরির লক্ষ্য তাঁদের।

ভবিষ্যতে ফাঁদটিকে সৌরশক্তিতে চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ওয়াই-ফাই ছাড়াই দূরবর্তী স্থানে তথ্য পাঠানোর জন্য দীর্ঘপাল্লার রেডিও তরঙ্গভিত্তিক যোগাযোগপ্রযুক্তি লোরাওয়ান (LoRaWAN) যুক্ত করার কাজ চলছে। যন্ত্রটিকে রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করে তোলার উদ্যোগও রয়েছে।

গবেষক দলে রয়েছেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, এ এম এম মুনিফ খান, ফাহাদ আরেফিন ও আসিফ রহমান দীপ্ত; প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুঈদ, প্রভাষক আতিয়া সানজিদা শর্মী, মো. সিয়াম সরকার ও নিলয় হাওলাদার এবং আতিক বিন জাকির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিলের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম যন্ত্রটি তৈরির জন্য গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে, তা জানা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়। এডিস শনাক্তের যন্ত্রটি এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি যন্ত্রটির আরও উন্নয়ন ও কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জীবনঘনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রযুক্তিটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এর ব্যবহার সম্ভব হলে এডিস মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ সহজ হতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগেভাগে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।