দেশের প্রায় ৪০ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ নেই, নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশে বাড়ছে অসন্তোষ
দেশের প্রায় ৪০ হাজার বেসরকারি এমপিওভুক্ত নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৭৮৭ দিন ধরে নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি ছাড়াই চলছে। দফায় দফায় অ্যাডহক কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিধিগত বাধ্যবাধকতার কারণে এসব কমিটি আর্থিক কার্যক্রম ও নিয়োগসহ বিভিন্ন কাজ করতে পারছে না।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজধানীসহ সারা দেশে নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছিল। তবে নতুন প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়ার কারণ দেখিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ জানিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এতে কমিটি নির্বাচন আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অসন্তোষ বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনার কথা জানানো হয়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন স্থগিত রাখার মধ্য দিয়ে অ্যাডহক কমিটিকে আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি বাণিজ্যের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে কি না।
নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদ অভিভাবক ঐক্য ফোরামের
দেশের সব স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্তকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম। বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু ও সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া এ সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, কিছুদিন ধরে এক শ্রেণির আমলা স্কুল-কলেজের নির্বাচন হতে দেবেন না বলে যে আলোচনা চলছিল, বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে ব্যবহার করে ঠুনকো অজুহাতে সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে অভিভাবকেরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন বলেও তাঁরা জানান।
চলমান নির্বাচনি প্রবিধানমালার আলোকে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে সংগঠনটির নেতারা বলেন, সংশোধনের দোহাই দিয়ে নির্বাচন বন্ধ করা যাবে না। গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে বেসরকারি স্কুল-কলেজের প্রশাসন তথাকথিত আমলাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।
বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হয়েছে
অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনসংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০২৬ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কমিটি গঠনের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বেসরকারি নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক কর্মকর্তা জানান, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নিয়মিত কমিটি গঠনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রবিধানমালা তৈরিতে কিছুটা সময় লাগছে। শিগগিরই প্রবিধানমালা চূড়ান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে অ্যাডহক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আগের নির্দেশনা বহাল থাকবে।
নতুন প্রবিধানমালার খসড়ায় যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব রেখে বিদ্যমান প্রবিধানমালা সংশোধনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি এবং কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি রাখার প্রস্তাব বহাল রয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় খসড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন শ্রেণির সদস্য নির্বাচন করতে হবে। সদস্য নির্বাচন শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ওই সভায় সভাপতিত্ব করবেন। উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হবেন। তবে এ সভায় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাঁদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পদত্যাগ, মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে সভাপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন সভাপতি নির্বাচনের বিধানও রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালায় সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত নতুন প্রবিধানেও কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ যোগ্যতা অর্জন বাধ্যতামূলক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা কর্মচারী ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না। একই ব্যক্তি একই ধরনের সর্বোচ্চ দুটি এবং মেয়াদভিত্তিক ধরনের সর্বোচ্চ তিনটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন বলেও প্রস্তাব করা হয়েছে।
গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রবিধান অনুযায়ী, স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম প্রস্তাব করার বিধান ছিল।
অ্যাডহক কমিটির নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষমতা নেই
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কলেজ পর্যায়ে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত, পরিচালনা কমিটিকে গভর্নিং বডি এবং মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিকে ম্যানেজিং কমিটি বলা হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এসব কমিটির অনুমোদন দেয়। স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোর গভর্নিং বডির অনুমোদন দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
কোনো কারণে নিয়মিত কমিটি গঠন করা না গেলে অথবা কমিটি বাতিল বা ভেঙে দেওয়া হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। এ কমিটির সভাপতি হন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের মনোনীত ব্যক্তি। সদস্য হিসেবে থাকেন একজন শিক্ষক ও একজন অভিভাবক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
অ্যাডহক কমিটি গঠনসংক্রান্ত সর্বশেষ বিধিমালায় বলা হয়েছে, এ কমিটি কোনোভাবেই অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপারিনটেনডেন্ট, সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট, গ্রন্থাগারিক, সহকারী গ্রন্থাগারিক বা কোনো কর্মচারী বাছাই ও নিয়োগ করতে পারবে না। কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর ওপর দণ্ড আরোপের প্রয়োজন হলে শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিতে হবে।
বিধি অনুযায়ী, অ্যাডহক কমিটির কাউকে চাকরিচ্যুত করা বা নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়। বেসরকারি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ শিক্ষার্থী।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে নির্বাচিত কমিটি নেই
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০ আগস্ট দেশের সব বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের অপসারণ করা হয়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ।
ওই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২৪-এর ৬৮ ধারা অনুযায়ী সভাপতির পদে থাকা সবাইকে অপসারণের কথা জানানো হয়। এরপর উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনাররা তাঁদের প্রতিনিধির মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হয়।
এর তিন মাস পর, ২০ নভেম্বর, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নতুন প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত রাখার সর্বশেষ নির্দেশনায় নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ গঠন আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আরও পড়ুন:







