বৃহস্পতিবার

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু জবাই নিষিদ্ধ নেপথ্যে কী?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৭

শেয়ার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু জবাই নিষিদ্ধ
নেপথ্যে কী?
ছবি সংগৃহীত

এক হাঁড়ি খিচুড়ি, কয়েক টুকরো ইট আর একটি ভিডিও! অথচ এই সামান্য আয়োজনকে ঘিরেই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর একের পর এক অপপ্রচার।

বিদায়ভোজের আয়োজন ও আপত্তি

গত ১২ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজন করেন বিদায়ভোজের।

প্রক্টর অফিসের মৌখিক অনুমতি নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের সামনে উন্মুক্ত স্থানে লাকড়ি দিয়ে ভোজের আয়োজন করা হয়। এ সময় পাশে পড়ে থাকা কয়েকটি ইট দিয়ে অস্থায়ীভাবে একটি চুলাও তৈরি করা হয় বলে জানা যায়।

এ সময় মন্দিরের পাশে গরুর মাংস রান্না করা নিয়ে আপত্তি তোলেন একজন সনাতনী শিক্ষার্থী। তাঁর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিক্ষার্থীরা সঙ্গে সঙ্গেই সেই স্থান ত্যাগ করেন। পরে ভলিবল কোর্টের পাশে মন্দিরের কাছে থাকা সেই সংগৃহীত ইট দিয়েই রান্নার আয়োজন করা হয় বলে জানা যায়।

কিন্তু বিপত্তি বাধে এখানেই। পরে শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন, মন্দিরের পাশে থাকা ইটগুলো মন্দিরের মালিকানাধীন। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই ইটগুলো সরিয়ে ফেলা হয় বলে জানা যায়।

ভারতীয় গণমাধ্যমে অপপ্রচার

কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকেই মুখরোচকভাবে উপস্থাপন করে, বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে মিথ্যা তথ্য মিশিয়ে অপপ্রচার শুরু করে ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশ। একটি বিদায়ভোজের আয়োজন ঘিরে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। ভারতীয় গণমাধ্যম রিপাবলিক বাংলা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তোলে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও দাবি করে গণমাধ্যমটি।

এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল-বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখে ঘটনার নিরপেক্ষ সমাধানের আশাও প্রকাশ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পশু জবাই নিষিদ্ধ করে। ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আজম খানের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ এবং পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জকসুর প্রতিবাদ ও দাবি

কিন্তু প্রশাসনের এ বিজ্ঞপ্তির পরপরই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জকসু।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতর্কিত নোটিশ প্রত্যাহার ও প্রকাশ্যে প্রশাসনের দুঃখপ্রকাশ, পাশাপাশি ক্যাফেটেরিয়ার নিয়মিত মেনুতে গরু ও খাসির মাংস অন্তর্ভুক্ত করাসহ চার দফা দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জমে থাকা পানি ও মশার উপদ্রবের মতো সমস্যার সমাধান না করে পশু জবাই নিষিদ্ধের নোটিশ জারির মাধ্যমে পরিস্থিতি উসকে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

প্রশাসনের দুঃখ প্রকাশ

তবে ক্যাম্পাসে বিতর্ক সৃষ্টি হলে দুঃখ প্রকাশ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। একই সঙ্গে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সবার রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে একটি আয়োজন যেন অন্যের আয়োজনে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জকসু নেতৃবৃন্দের ক্ষোভ

এদিকে মুক্তমঞ্চে বিদায়ভোজের আয়োজনকে ‘মন্দিরে গরু রান্না’ হিসেবে উপস্থাপন করে ভারতীয় গণমাধ্যমে অপপ্রচারের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জকসু নেতৃবৃন্দ।

এমনকি এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জয় সাহার বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করার কারণে তাঁর বিচারের দাবিও জানান তাঁরা।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ঘটনাটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জয় সাহা অযাচিতভাবে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের।

অপরদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু জবাই নিষিদ্ধের প্রতিবাদে আগামী ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর), গরুর মাংস দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গণভোজের আয়োজন করেছেন বলেও জানা যায়। তবে ঘটনাটি কে বা কাদের মাধ্যমে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



আরও পড়ুন: