এক টুকরো সাদা কাগজে পেন্সিলের আঁকিঝুঁকি কষে যে শৈশব ডানা মেলার কথা ছিল, তা যেন এখন থমকে গেছে এক নারকীয় ভীতি আর ট্রমায়। ক্লাস টু-এর প্রথম স্থান অর্জনকারী ছোট্ট আয়াতের জন্য স্কুলের ক্লাসরুমটি শেখার এক নিরাপদ আঙিনা হওয়ার কথা ছিল; অথচ সেই চেনা চত্বরই একদিন বদলে গেল আতঙ্কের এক বন্দিশালায়।
পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকার বাসিন্দা, আফরিনা হাসনাতের কোল আলো করে এসেছিল এক মেধাভরা মুখ জাদওয়া আয়াত কায়নাত। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডের অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পুরান ঢাকা ক্যাম্পাসে, দ্বিতীয় শ্রেণীতে যার মেধার স্বাক্ষর সর্বদা প্রথম সারিতে। যে শিশুমনে প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্নের বুনন হওয়ার কথা, সেই রঙিন ক্যানভাসে গত রবিবার (৩০ আগস্ট) নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
শ্রেণিকক্ষে নির্যাতনের বিবরণ
দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে লিটারেচার ক্লাসে বোর্ডে লেখা শব্দের অর্থ খাতায় তুলতে গেলে শিক্ষিকা তাসনিম আজাদ সুপ্তি হঠাৎই আয়াতের খাতাটি কেড়ে নিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। নিয়মনিষ্ঠ শিশুটি অন্য একটি খাতায় লিখতে গেলে সেটিও ব্যাগে রাখতে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া, নানা সময়ে ওই শিক্ষক, এই শিশুকে নির্যাতন করতো বলে জানাযন, ভুক্তভোগী শিশু আয়াত। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সিসিটিভি ক্যামেরাতেও।
মা রাতে ক্লাসের পড়া দেখতে চাইবেন এই অবোধ আকুলতায়, বইয়ের একটি সাদা পাতায় গোপনে লিখতে শুরু করেন আয়াত। আর তাতেই যেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন শিক্ষিকা সুপ্তি। অন্য সব শিক্ষার্থীকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে আয়াতের ডান পায়ে সজোরে পা দিয়ে পিষে ধরেন তিনি। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠা শিশুর হাত মটকানোর হুমকি দিয়ে খাতাটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা হয়। কানের ইনফেকশনে অসুস্থ শিশুটি আতঙ্কে আর কান্নায় একপর্যায়ে শ্রেণীকক্ষেই প্রস্রাব করে দেয়।
ছুটির পরও নির্যাতন অব্যাহত
এদিকে, ছুটির পর দীর্ঘ ৪০ মিনিট আট বছর বসয়ী শিশুকে আটকে রেখে নির্যাতন চালানোর পর, আয়াত নিচে থাকা ভাইস প্রিন্সিপালকে বিষয়টি জানানোর কথা বললে, আরও হিংস্র হয়ে ওঠেন ওই শিক্ষিকা। এসময়, ছোট্ট ওই শিক্ষার্থীর চোখ উপড়ে ফেলার হুমকি দেন শিক্ষক। এমনকি সেই উদ্দেশ্যে সূচালো পেন্সিল দিয়ে আঘাত করলে, আয়াতের ডান চোখে রক্তাক্ত জখম হয়। আতঙ্কে সেখান থেকে দৌড়ে নিচে নেমে, শিক্ষার্থী আয়াত স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইশানাসহ, পরিচিত অভিভাবকদের কাছে আকুতি করেন বাঁচার।
কিন্তু, রক্তে ভেজা শিশুটির এই মর্মান্তিক আঘাতকে লঘু করার চেষ্টা করেন ভাইস প্রিন্সিপাল রুহুল ইসলাম ও বিদ্যালয়ের পরিচালকসহ কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে মা আফরিনা হাসনাত স্কুলে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সত্যতা পেলেও, উল্টো দায়িত্বহীন বক্তব্য দেয় দায়িত্বরতরা।
মামলা দায়ের ও শিশুর বর্তমান অবস্থা
ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানে আইনি নোটিশের পর বাধ্য হয়ে গেন্ডারিয়া থানায় মা আফরিনা হাসনাত একটি মামলা করেন।
এসব নির্যাতনের পর আয়াতের মা জানান, এখনো ঘুমের মাঝে তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন তার মেয়ে। কেউ তার চোখ তুলে নেবে—এমন ভয়েই প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত হচ্ছেন আয়াত। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গেলে সে মারা যাবে বলেও জানাযন মাকে।
শিশু আয়াতকে নির্যাতনের বিষয়টা সাধারণ ভাবে দেখছেন না মা আফরিনা হাসনাত। এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা বলেও দাবি করেন তিনি। এর পেছনে হত্যার উদ্দেশ্য আছে বলেও মনে করেন তিনি।
স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কর্তৃপক্ষের কেউ ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে তারা জানায়, শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের আংশিক সত্যতা পাওয়ার পর, কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম আজাদ সুপ্তিকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
মামলার বর্তমান পরিস্থিতি
মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান খান জানান, বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আর এদিকে, ভুক্তভোগী মা তিনজনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগ দায়ের করলেও প্রথম অভিযুক্তকে রেখে বাকি দুজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
তবে, মামলার সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিপাশা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
যে শিক্ষক হওয়ার কথা ছিল পরম স্নেহের আশ্রয়, যে প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে নিরাপদ নীড়—সেখানেই এক নিষ্পাপ শিশুর শৈশব থমকে গেছে রক্ত আর আতঙ্কের স্মৃতিতে। তদন্তের দেয়াল ভাঙার আকুতি নিয়ে এক মা বিচারের দরজায় কড়া নাড়ছেন; এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়ায় আয়াতের সেই হারিয়ে যাওয়া হাসি আর ন্যায়বিচার ফিরে আসে কি না।
আরও পড়ুন:







