বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

মবের শিকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অভিযোগ তদন্তে আসছে জাতিসংঘ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৭

আপডেট: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৬

শেয়ার

মবের শিকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অভিযোগ তদন্তে আসছে জাতিসংঘ
ছবি সংগৃহীত

জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকারবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শাহিদ আগামী ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশে আসছেন। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মবের শিকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ তদন্ত করবেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করবে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ঢাকা অফিস।

ফরিদা শাহিদ ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকবেন। তাঁর বাকি কর্মসূচি নভেম্বরের শুরুতে চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি মবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং এ ধরনের ঘটনায় মারা যাওয়া শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন।

মবের শিকার শিক্ষকদের সংগঠন পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট এ তথ্য জানিয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, বেপরোয়া মবকারীদের হাতে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত আটজন শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পর মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন। ৯৪০ জন শিক্ষক এখনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মবের শিকারদের বেশির ভাগই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।

ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক নেতারা জানান, এ বিষয়ে সরকারি কয়েকটি নির্দেশনা জারি হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে দুই বছর ধরে অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কারও শিক্ষক ইনডেক্স বাতিল করা হয়েছে, আবার কারও বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আদালত ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বারবার আবেদন করেও অনেকে প্রতিকার পাননি।

পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোটের সভাপতি এবং ঢাকা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. বেদার উদ্দিন আহমেদ জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ ও স্মারকলিপি দিয়ে আসছেন। সরকারি নির্দেশনা থাকার পরও অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। জাতিসংঘের দল ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের বক্তব্য শুনলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

জোটসূত্র জানায়, মবের শিকার শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় তথ্যউপাত্তসহ তাঁদের অভিযোগ জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকার কমিশনে পাঠিয়েছেন। অভিযোগ পাঠানোর জন্য জাতিসংঘ থেকে একটি ফরমও দেওয়া হয়েছে। এতে ২০০০ শব্দের মধ্যে অভিযোগ ও তথ্যউপাত্ত পাঠাতে বলা হয়েছে। হেনস্তার বিবরণ, বর্তমান অবস্থা, অভিযোগ বা মামলার তথ্য, ঘটনার ছবি, ভিডিও, অডিও, আইন অমান্যের প্রমাণসহ অন্যান্য সহায়ক তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে।

তবে এ পর্যন্ত কতজন শিক্ষক জাতিসংঘের কাছে অভিযোগ পাঠিয়েছেন, সেই সংখ্যা জানা যায়নি। একই সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীও মবের শিকার হয়েছেন। সংগঠনের পদধারী শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি। অনেকে পরীক্ষা দিতে গিয়েও মবের শিকার হয়েছেন।

জোটের সাধারণ সম্পাদক ও ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার জানান, জোর করে পদত্যাগ, শারীরিক লাঞ্ছনা, বেতন বন্ধ করে দেওয়া ও কর্মস্থলে যেতে বাধা দেওয়ার কারণে শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নির্দেশনা জারির পরও কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি অনেকে

শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরের মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে নির্দেশনা জারি করে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের সমস্যার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বেতন-ভাতা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ৭ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে চাকরি পুনর্বহাল এবং ইএফটির মাধ্যমে বেতন-ভাতা চালুর কথা বলা হয়। ৭ অক্টোবর সরকারি আদেশ অমান্যকারী ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১ জানুয়ারির পরিপত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদানে বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান এসব নির্দেশনা মানেনি। তাঁদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কেউ কেউ এখনো বেতন-ভাতা চালু করেননি। ইএফটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও হালনাগাদ করা হচ্ছে না।

ফলে অন্তত ৯৪০ জন শিক্ষক বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত আছেন। এ ছাড়া প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি।

হামলার পর অচেতন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন প্রধান শিক্ষক

মবের শিকার শিক্ষকদের একজন রাজধানীর আরমানিটোলার আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেন। একই দিন কমিটি ছাড়াই মোখলেছুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন।

নাজমা বেগমের অভিযোগ, এরপর তাঁর স্কুল ও সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। তদন্তের কাজে বিদ্যালয়ে গেলে তাঁর ওপর হামলা হয়। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রাত দেড়টার দিকে পুলিশ তাঁকে বাসা থেকে ধরে থানায় নিয়ে যায় এবং আদালতে পাঠায়।

নাজমা বেগম জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তাঁর সরকারি বেতন ছাড় করে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইএফটির মাধ্যমে স্কুল ও সরকারি বেতন পেলেও বদলির জন্য প্রয়োজনীয় এনওসি ও পাসওয়ার্ড নিয়ে সমস্যা কাটেনি বলে জানান তিনি। তাঁর তিন সন্তানের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বিধবা এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগে সই নেওয়ার অভিযোগ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় এবং সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমও ২০২৪ সালের আগস্টে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেন।

ফারহানা খানমের অভিযোগ, তাঁকে চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়েছে। সাদা কাগজেও বাংলা ও ইংরেজিতে সই নেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায়কেও জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি সাধারণ শিক্ষক হিসেবে থাকতে চাইলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

পদবঞ্চিত শিক্ষক জোটের নেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও বহিরাগতদের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ওপর চড়াও হয়। তাঁদের দাবি, কোথাও পদ দখল, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ এবং কোথাও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

মবের মাধ্যমে পদত্যাগ করানোর পর কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটি বা অবসর দেওয়া কিংবা বরখাস্ত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে অস্থিরতা এবং পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আদালতে যাওয়ার পরও অনিশ্চয়তা কাটেনি

রাজধানীর সোলমাইদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আফরোজা বেগম জানান, জোরপূর্বক পদত্যাগ করা শিক্ষকদের অধিকার ও পুনর্বহাল নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। তিনিও ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করা শিক্ষকদের পক্ষে হাইকোর্টের একটি রায় হয়েছে বলে জানান তিনি।

কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার বলেন, প্রশাসনিক নির্দেশনা ও আদালতের আদেশের পরও কোনো প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকরা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবেন।

মবের ঘটনায় শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ

রাজধানীর বিসিএসআইআর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. মো. ইদ্রিস আলী জানান, শিক্ষককে অপমান, শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা বা মবের চাপে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ভেঙে পড়লে শৃঙ্খলা ও পাঠদানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক নেতাদের মতে, জাতিসংঘের তদন্তে জোরপূর্বক পদত্যাগ ও মব-সহিংসতার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টিও স্থান পাওয়া উচিত।