রাজধানীর মাতুয়াইলে একটি ছাপাখানার তিন ট্রাকভর্তি ৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০১ কপি মাধ্যমিকের পাঠ্যবই জব্দ করে পুনরায় মান যাচাইয়ের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। ৬০ শতাংশ বই নিম্নমানের বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের পর বইগুলো আটকে দেওয়া হলেও তিন দিন পর যাচাইয়ে মাত্র ১৪৬ কপির কাভারে দাগ পাওয়া যায়। এসব বই বাতিল করে বাকি ৪ লাখ ৩০ হাজার ২৫৫ কপি ডেলিভারির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের বইগুলো ই-টেন্ডারের মাধ্যমে এনসিটিবির মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের কাজ পাওয়া ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন শেষে মাঠ পর্যায়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ছাপাখানার সামনে থেকে তিনটি ট্রাকে বইগুলো তোলা হয়। পরে একটি গোয়েন্দা সংস্থা এনসিটিবিকে জানায়, বইগুলোর ৬০ শতাংশ নিম্নমানের। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর এনসিটিবির মনিটরিং টিমের পাশাপাশি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিন ট্রাকের বই জব্দ করেন। তিন দিন বই আটকে রেখে পুনরায় মান যাচাই করা হয়। এতে ১৪৬টি বইয়ের কাভারে দাগ শনাক্ত হয়। এগুলো বাতিল করে ৪ লাখ ৩০ হাজার ২৫৫ কপি বই ডেলিভারির অনুমতি দেওয়া হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ৬০ শতাংশ বই নিম্নমানের বলে যে তথ্যের ভিত্তিতে বইগুলো আটকানো হয়েছিল, পুনরায় যাচাইয়ে তা কীভাবে মাত্র ১৪৬টি ত্রুটিপূর্ণ বইয়ে সীমাবদ্ধ হলো। ইন্সপেকশন এজেন্টের প্রতিবেদন সঠিক ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পিডিআই নিয়ে ইন্সপেকশন এজেন্টের আপত্তি
অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের স্বত্বাধিকারী মিন্টু মোল্লা জানান, তার ছাপাখানার বইগুলো প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন করেছিল ইন্সপেকশন এজেন্ট। পরে এনসিটিবির মনিটরিং টিম যাচাই-বাছাই করে কিছু বইয়ে ত্রুটি পায়। সেগুলো পুনরায় ছাপিয়ে দেওয়া হবে।
ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসাইন জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের সঙ্গে যুক্ত। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ইন্সপেকশনের কাজ পেয়েছেন। আইন অনুযায়ী তার প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন বা পিডিআই করার কথা থাকলেও এনসিটিবির মনিটরিং টিম ছাড়া তিনি তা করতে পারছেন না। তার দাবি, আইনে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই।
তিনি জানান, গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে একটি ছাপাখানার পিডিআই করার কথা ছিল। এনসিটিবির মনিটরিং টিমকে বিষয়টি জানানো হলেও তারা যেতে পারেনি। ফলে পিডিআই করতে তিন দিন বিলম্ব হয়। এ ধরনের ঘটনা আরও রয়েছে বলে তিনি জানান। শুক্রবারেও এনসিটিবির মনিটরিং টিম সময় দিতে পারে না বলেও দাবি করেন তিনি।
অটো প্রিন্টিং প্রেসের বইয়ের ৬০ শতাংশ নিম্নমানের বলে আটকে রাখার প্রসঙ্গে শেখ বেলাল হোসাইন বলেন, পরে পরীক্ষানিরীক্ষায় মাত্র ১৪৬ কপি বইয়ের কাভারে সামান্য দাগ পাওয়া গেছে। এতে তার পিডিআই প্রতিবেদন সঠিক ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি পিডিআইয়ে বিলম্ব হলে নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর দায়ভার তার ওপর আসতে পারে বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগামী নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা থাকলেও শুক্রবার (২ অক্টোবর) পর্যন্ত মাধ্যমিকের মাত্র ৫ শতাংশ বই ডেলিভারি হয়েছে। এই ধীরগতি অব্যাহত থাকলে সব বই সরবরাহ করতে আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দুটি ছাপাখানার কাজ কেটে দেওয়ার অভিযোগ
এনসিটিবির মনিটরিং টিমের আরেকটি কর্মকাণ্ডে ভাইভাই ও বর্ণশোভা ছাপাখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি এসব ছাপাখানার বিপুল পরিমাণ কাজ কেটে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে কাগজে ৬৮ জিএসএম পাওয়া যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৬৮ জিএসএমের কাগজ প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ে গ্রহণযোগ্য না হলেও মাধ্যমিকের বইয়ে তা গ্রহণযোগ্য। বিষয়টি এনসিটিবির মনিটরিং টিম জানত না এবং ইন্সপেকশন এজেন্ট তাদের এই ভুল সিদ্ধান্তের বিষয়টি ধরিয়ে দেয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
নিম্নমানের বই নিয়ে শঙ্কা
আগামী বছরের বিনা মূল্যের পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি বলে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক ছাপানো ও বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দরপত্রের শর্তের তুলনায় কম জিএসএমের কাগজ ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও বাঁধাইয়েও ত্রুটি ধরা পড়েছে।
সূত্রটির দাবি, এ পর্যন্ত নিম্নমানের যেসব পাঠ্যবই কিংবা ফর্মা কেটে ফেলা হয়েছে, সেগুলো ছোট ছাপাখানার। বড় ছাপাখানার রাঘববোয়ালরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। শেষ সময়ে যাচাইয়ের সুযোগ কম থাকায় কিছু ছাপাখানা সেই সুযোগ নিতে চায় বলেও দাবি করা হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাজধানীর ছয়টি ছাপাখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বইয়ের গুণমান ও ছাপার কাজের অগ্রগতি যাচাই করেন।
এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান বজায় রাখতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাগজের ফর্মা বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ছাপাখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হচ্ছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপার কাজ এগিয়ে চলছে। কোনো ধরনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। ফর্মার মান খারাপ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কেটে দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ছাপাখানা মালিকদের শঙ্কা
কয়েকটি ছাপাখানার মালিকেরা বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালানোর বাড়তি ব্যয় পোষাতে গিয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বইয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের সুযোগ খুঁজতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।
এনসিটিবির সদস্য পাঠ্যপুস্তক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের বলেন, পাঠ্যবইয়ের মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বই ছাপার কাজ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন:







