বুধবার

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

নকল ছাপায় অনুমোদিত পাঠ্যবই, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:৪৩

শেয়ার

নকল ছাপায় অনুমোদিত পাঠ্যবই, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
ছবি সংগৃহীত

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পাঠদান শুরু হওয়ার কথা। এ শ্রেণির জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বিভিন্ন পাঠ্যবই অনুমোদন দিয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশনী ইতোমধ্যে এসব বই প্রকাশ করে দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাঠিয়েছে। এর মধ্যেই অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ অবৈধ ছাপাখানায় তৈরি ও বাজারজাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র বেনামি ছাপাখানায় অনুমোদিত পাঠ্যবই নকল করে বাজারজাত করছে। এতে শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি বৈধ প্রকাশকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

হাজারীবাগে নকল বই ছাপার অভিযোগ

প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর গুদারাঘাটসংলগ্ন পানির ফ্যাক্টরির গলিতে নামবিহীন একটি ছাপাখানায় এনসিটিবির অনুমোদিত বই ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ চলছিল। ছাপাখানাটির মালিক হিসেবে মানিক মিয়া নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে সেখানে অনুমোদিত পাঠ্যবই অবৈধভাবে ছাপার অভিযোগ করেন তারা।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নকল বই ছাপা ও বাঁধাইয়ের খবর পেয়ে হাজারীবাগ থানার এসআই আশরাফসহ বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সেখানে যান। এ সময় নকল বইয়ের বিপুল পরিমাণ ফর্মা এবং বইয়ের কাভার বাঁধাইয়ের জন্য অপেক্ষমাণ অবস্থায় পাওয়া যায়।

প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেখানে থাকা ফর্মার অধিকাংশই এনসিটিবির অনুমোদিত সিলেবাসের আলোকে তৈরি পাঠ্যবইয়ের। এর মধ্যে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি এবং হাসান বুক হাউজের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বইয়ের ফর্মা ছিল বলে তারা জানান।

জব্দ কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগ

প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুলিশ ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বই ও ছাপার ফর্মার জব্দ তালিকা তৈরির সময় ফয়সাল ও মাসুদ রানা নামে দুজনের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল সেখানে আসে। তারা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, গালিগালাজ ও মারমুখী আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তাদের দাবি, মাসুদ রানা ও তার সঙ্গীরা নিজেদের সরকারি দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে পুলিশ ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে তারা বই জব্দে পুলিশকে বাধা দেন এবং হাসান বুক হাউজের দুজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালান।

প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তাদের বাধার কারণে পুলিশ জব্দ কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি এবং ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

তাদের আরও দাবি, মাসুদ রানা ও তার একজন সঙ্গী আগের সরকারের সময়ও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে তারা নিজেদের বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অনুমোদিত বই ছাপার অভিযোগ অস্বীকার মাসুদের

অভিযোগ অস্বীকার করে মাসুদ রানা জানান, হাজারীবাগে কোনো নামবিহীন প্রেসে অনুমোদিত পাঠ্যবই ছাপার ঘটনা ঘটেনি। একটি বাইন্ডিং দোকানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল। একপর্যায়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হলে খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান।

তার ভাষ্য, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি হট্টগোল দেখতে পান। পরে পুলিশ সেখানে আসে এবং পুলিশের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। উভয়পক্ষ নিজেদের বক্তব্য দেওয়ার পর আর কোনো অভিযোগ বা আপত্তি না জানিয়ে চলে যায়।

মাসুদ রানা বলেন, সেখানে কোনো প্রেস বা বই নিয়ে ঝামেলা ছিল না। একটি ভ্যানের মালামাল ও বাইন্ডিং নিয়ে কথা-কাটাকাটি থেকে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। কর্মীদের ফোন পেয়ে তারা সেখানে যান এবং পরে পুলিশসহ দুই পক্ষের সমন্বয়ে বিষয়টি মীমাংসা হয়।

রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পুলিশ বই জব্দ করতে পারেনি—এ অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। ফয়সাল নামে কাউকে তিনি চেনেন না এবং পুলিশকে বাধা দেওয়ার কোনো ঘটনাও ঘটেনি বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, ঘটনাস্থলে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তাদের বাধা দেওয়ার মতো কোনো ক্ষমতাশালী অবস্থানও তাদের নেই।

হাসান বুক হাউজের পক্ষ থেকে হামলা এবং অনুমোদিত বইয়ের বিপরীতে নকল বই বাঁধাই করার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তার দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।

নকল বইয়ে প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনুমোদিত বই নকল করে বাজারজাত করায় বৈধ প্রকাশকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।

প্রকাশকদের ভাষ্য, অনুমোদিত বই প্রকাশ, মুদ্রণ ও বাজারজাত করতে তাদের বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বহন করতে হয় এবং সরকারকে নির্ধারিত রাজস্ব দিতে হয়। অন্যদিকে নকল বই প্রস্তুতকারীরা অনুমোদিত বইয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা কাঠামো ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে বই বাজারজাত করছে। এতে বৈধ প্রকাশকরা প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ, নকল বইয়ের কারণে শিক্ষার্থীরাও প্রতারিত হচ্ছে। অনুমোদিত বই মনে করে নকল সংস্করণ কিনলেও এসব বইয়ের মুদ্রণমান, সম্পাদনা এবং সর্বশেষ অনুমোদিত সংস্করণের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

নকল বই বন্ধে ব্যবস্থা চান প্রকাশকরা

সংশ্লিষ্টদের মতে, নকল বইয়ের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না হলে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। অবৈধ ছাপাখানায় অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল ছাপা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বৈধ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে তারা মনে করেন।

শিক্ষার্থীদের স্বার্থে অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ বাজারজাত বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে নকল বইয়ের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা।

দুপক্ষের সমঝোতায় পুলিশ চলে আসে

হাজারীবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ১৫ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত পাঠ্যবই নকল করার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। সেখানে কয়েকটি প্রকাশনীর বই ছিল।

ওসি বলেন, পুলিশ যাওয়ার পর বাদীপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা হয়। দুই পক্ষ বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়ায় পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে।

ঘটনাস্থলে কয়েকটি প্রকাশনীর বই ছিল জানিয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন ওসি।

এদিকে হাজারীবাগের নামহীন ছাপাখানায় নকল বই ছাপার অভিযোগ ওঠা মালিক মানিক মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফোনে কল রিসিভ না করার পাশাপাশি পাঠানো মেসেজেরও কোনো জবাব দেননি তিনি।