মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের তৎকালীন পরিচালক প্রফেসর ফকির মো. নূরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুই কলেজের পাঁচ শিক্ষকের বকেয়া বেতন-ভাতা বিধিবহির্ভূতভাবে অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী এসব শিক্ষক বকেয়া বিল পাওয়ার যোগ্য না হলেও উপপরিচালক (ডিডি) ও সহকারী পরিচালক (এডি) লিখিত আপত্তি জানানোর পরও একক ক্ষমতাবলে বিল অনুমোদন করা হয়।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ড. কাজী মোতাহার হোসেন কলেজের চার প্রভাষকের বকেয়া বিলের মধ্যে সংগীতের প্রভাষক মৃত্যুঞ্জয় পাঠকের ২০ লাখ ১০ হাজার ৪৭৬ টাকা, প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের ৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, প্রভাষক জাহিদুল ইসলামের ৯ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং প্রভাষক রফিকুল ইসলামের ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা রয়েছে।
এ ছাড়া গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কাহী মন্টু কলেজের সংগীতের প্রভাষক প্রশান্ত কুমার মধুর ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪১ টাকার বকেয়া বিলও অনুমোদন করা হয়। পাঁচ শিক্ষকের বিলের পরিমাণ যোগ করলে মোট ৬৪ লাখ ৫ হাজার ১১৭ টাকা হয়।
এনটিআরসিএর সুপারিশ ছাড়া বকেয়া পাওয়ার সুযোগ নেই
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৮ মার্চ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা জারির আগে নবনিযুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া প্রদানের নিয়ম ছিল না। ওই নীতিমালার ১৭.৭ ধারায় এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের যোগদানের তারিখ থেকে বকেয়া দেওয়ার বিধান রাখা হয়। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর জারি করা এমপিও নীতিমালাতেও এ বিধান বহাল রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই পাঁচ শিক্ষক এনটিআরসিএর সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে যোগদান করেননি। ২০২১ সালের নীতিমালা জারির অনেক আগেই তারা যোগদান করায় এমপিও নীতিমালা-২০১৫-এর ১১.১৬ ও ১৭.৭ ধারা অনুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রফেসর ফকির মো. নূরুজ্জামান ৬ আগস্ট বদলিজনিত কারণে অবমুক্ত হওয়ার আগে এসব বিল অনুমোদন করেন। বর্তমানে তিনি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) রয়েছেন।
নিবন্ধন সনদ না থাকা ১০ শিক্ষককে এমপিওভুক্তির অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জের সদর থানাধীন নারায়ণগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০ শিক্ষককে আইন ও বিধি বহির্ভূতভাবে এমপিওভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে তৎকালীন পরিচালক ফকির মো. নূরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, তিনি গত ২৮ জুন একক সিদ্ধান্তে এসব এমপিও ফাইল অনুমোদন করেন।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত হয়। ২০২৩ সালের ১৩ জুন আঞ্চলিক যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, কলেজ শাখার ১৫ শিক্ষকের মধ্যে ১০ জনের নিয়োগের সময় নিবন্ধন সনদ ছিল না।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-সংক্রান্ত ২০০৫ সালের ১ নম্বর আইনের ১০(২) ধারা অনুযায়ী নিবন্ধন সনদ ছাড়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ নেই। এসব বিষয়ে মামলা ও তদন্ত চলমান থাকার পরও কাম্য যোগ্যতা ছাড়া নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
জাল কাগজপত্রে এমপিও ও বকেয়া বিল অনুমোদনের অভিযোগ
গাজীপুরের সদর উপজেলার সাহাজ উদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী, যার মধ্যে ল্যাব সহকারীও রয়েছেন, কাম্য যোগ্যতা ও নিয়োগসংক্রান্ত জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত হয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। পরে তাদের বকেয়া বিলও বিধিবহির্ভূতভাবে অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে মো. নূরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এসব বিল ২০২৫ সালে অনুমোদন করা হয়।
ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক জান্নাতুল ফেরদৌসের নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর। তবে নিয়োগের সময় তার নিবন্ধন সনদ ছিল না। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া পর্যন্ত ব্যানবেইস ডাটাবেজে তার নাম পাওয়া যায়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, নতুন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যক্তি এমপিওভুক্তির জন্য যোগদানের পর থেকে বছরভিত্তিক ব্যানবেইস ডাটাবেজে নাম থাকা আবশ্যক।
এ ছাড়া এসব শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্তির জন্য জেলা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রত্যয়নও জাল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ডিডি ও এডির তদন্তে কমিটির একজন সদস্যের স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ফকির মো. নূরুজ্জামান জানান, নিয়ম মেনেই শিক্ষকদের বকেয়া বিল অনুমোদন করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিধিবহির্ভূত কোনো কাজ করেননি। এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লিখিত নির্দেশনা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
মাউশির ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের বর্তমান পরিচালক প্রফেসর মো. ইদ্রিস আলী জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে এসব বকেয়া বিল অনুমোদন ও এমপিওভুক্তির ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং এটি খতিয়ে দেখবেন।
আরও পড়ুন:







