শনিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

মানহীন ছাপায় পাঠ্যবইয়ের কোটি ফর্মা বাতিল, মালিক তলব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩৪

শেয়ার

মানহীন ছাপায় পাঠ্যবইয়ের কোটি ফর্মা বাতিল, মালিক তলব
ছবি সংগৃহীত

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যবই ছাপাতে ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বই ছাপার কাজে নিম্নমানের কাগজ, কালি ও মুদ্রণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে ৫২টি ছাপাখানায় অভিযান চালিয়ে প্রাথমিক স্তরের এক কোটির বেশি ফর্মা কেটে বিনষ্ট করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত মিনিস্ট্রি টিম, এনসিটিবির পরিদর্শন টিম ও ইন্সপেকশন এজেন্ট সরেজমিন পরিদর্শনে ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, আলট্রা ভার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ত্রুটি ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের ঘটনা শনাক্ত করেছে। কয়েকটি ছাপাখানায় বইয়ের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠায় ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করে ভেতরের পৃষ্ঠায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের ঘটনাও পাওয়া গেছে।

এবার পাঠ্যবই মুদ্রণে গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বেশি খরচ ধরা হয়েছে। ছাপাখানাগুলো সিন্ডিকেট করে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০০ কোটি টাকা বেশি দর দেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দুই ছাপাখানায় নিম্নমানের কালি জব্দ

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) মোল্লা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিংয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে নিম্নমানের পাঠ্যবই শনাক্ত করে মিনিস্ট্রি টিম। সেখানে পঞ্চম শ্রেণির সমাজ বিজ্ঞান বইয়ের মানচিত্রের রং পরিবর্তন এবং মানচিত্রের পাশের লেখা অস্পষ্ট থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। এসব বই কেটে বিনষ্ট করা হয়।

একই সঙ্গে দুই ছাপাখানা থেকে পাঠ্যবই মুদ্রণে ব্যবহৃত প্রচুর পরিমাণ নিম্নমানের কালি জব্দ করে ড্রেনে ফেলে বিনষ্ট করা হয়।

পরদিন বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এনসিটিবিতে গেলে ওই দুই ছাপাখানার মালিক মিন্টু মোল্লাকে তলব করা হয়। নিম্নমানের কালি ব্যবহার করে পাঠ্যবই ছাপানোর বিষয়ে তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চান শিক্ষামন্ত্রী। ভবিষ্যতে ভুল বা অনিয়ম করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিন্টু মোল্লা ক্ষমা চান।

মিন্টু মোল্লা জানান, সামান্য কিছু পাঠ্যবইয়ে ত্রুটি ছিল। সেগুলো পুনরায় ছাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আরও কয়েকটি ছাপাখানায় নিম্নমানের বই

রেদওয়ানিয়া প্রেস এন্ড পাবলিকেশনে মিনিস্ট্রি টিম ও এনসিটিবির ইন্সপেকশন এজেন্ট নিম্নমানের পাঠ্যবই শনাক্ত করে সেগুলো কেটে ফেলে। লেটার এন্ড কালার ছাপাখানায় নিম্নমানের পাঠ্যবই ও এসো লিখতে শিখি খাতা ছাপানোর বিষয়টি ধরা পড়লে সেগুলো জব্দ করে কেটে ফেলা হয়।

ফরাজি প্রেসেও নিম্নমানের পাঠ্যবই জব্দ করে মিনিস্ট্রি টিম। এ সময় একটি বড় ছাপাখানার মালিক সেখানে গিয়ে নিম্নমানের বই কাটতে বাধা দেন। এতে মিনিস্ট্রি টিম ক্ষুব্ধ হয়।

এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ ছাপাখানায় দরপত্রের শর্ত মানা হচ্ছে না। বড় কোম্পানির কাগজ মিলের সরবরাহ করা কাগজের পরিবর্তে অনেক ছাপাখানা ছোট কাগজকল থেকে কম দামে কাগজ কিনে পাঠ্যবই ছাপাচ্ছে। কাটিংয়ের মান নিয়েও ত্রুটি পাওয়া গেছে।

ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে হুমকির অভিযোগ

এনসিটিবির প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের দায়িত্ব পেয়েছে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজীম মুনিরকে নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন করাতে না পেরে দুই কাগজ সরবরাহকারী তাঁকে জীবননাশের হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পাঠ্যবই ছাপানোর আগে কাগজের অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এ অনুমোদন দেয় এনসিটিবির ইন্সপেকশন এজেন্ট।

সক্ষমতার চেয়ে বেশি কাজ পাওয়ার অভিযোগ

এনসিটিবির কন্ট্রোলার মো. লুত্ফর রহমান বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান ঠিক রাখতে এবার কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অনিয়মে জড়িত একটি ছাপাখানার মালিককে তলব করে সতর্ক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে সিন্ডিকেটের কারণে অনেক ছাপাখানার মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকের সক্ষমতার তিন ভাগের এক ভাগ কাজও মিলছে না। আবার কেউ কেউ সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কাজ পাচ্ছেন। তিনি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার কথা বলেন।

মাধ্যমিকের বইয়ের মান নিশ্চিতে প্রশিক্ষণ

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের গুণমান নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির নির্দেশনায় বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি।

কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মো. আবু নাসের টুকু। ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসাইন বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। সঠিকভাবে যাচাই করেই কাগজের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।