শুক্রবার

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

হাসিনার ধ্বংস করা শিক্ষা ব্যবস্থায় ধুঁকছে ঢাবির শিক্ষার্থীরা!

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:০১

শেয়ার

হাসিনার ধ্বংস করা শিক্ষা ব্যবস্থায় ধুঁকছে ঢাবির শিক্ষার্থীরা!
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়—একটি জাতির মেধা, মনন আর ভবিষ্যৎ নির্মাণের অপ্রতিরোধ্য কারখানা। আর বাংলাদেশের সেই কারখানার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে বিদ্যাপীঠের প্রতিটি দেয়ালে মিশে আছে দেশের ইতিহাস, আন্দোলন-সংগ্রাম আর অসংখ্য মেধাবী মানুষের পদচিহ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই-তিন দশক আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মানেই ছিল আলাদা এক পরিচয়, ভিন্ন এক গ্রহণযোগ্যতা। দেশের অন্যতম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে বের হওয়া মানেই ছিল শিক্ষার্থীদের সামনে কর্মজীবনের এক সুবিশাল পথ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই বাস্তবতায় যেন ভাটা পড়েছে অনেকটাই। একসময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জগতে প্রভাবসৃষ্টিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও এখন বেকারত্বের হার বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর আগের সেই জৌলুশ নেই। এমনকি এখানকার ডিগ্রিধারীদের কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের চিত্র নিয়েও দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে সমালোচনা রয়েছে।

শিক্ষার মানে অবনতির পেছনের কারণ

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, দেশের শিক্ষাঙ্গনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়কার দাপট ও প্রভাব কমে যাওয়ার পেছনে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্ন, একাডেমিক পরিবেশের অবনতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবসহ একাধিক কারণ সামনে আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের অবনতির পেছনে শিক্ষকদের মান নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচনা রয়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিক ও পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে দক্ষ, মেধাবী ও গবেষণামুখী শিক্ষকদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেই যোগ্য শিক্ষকদের উপস্থিতি এখন আর আগের মতো নেই।

সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সাম্প্রতিক সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম যাচাইয়ের উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ সংবাদে এসেছে।

একাডেমিক পরিবেশের অবনতি

আরেকটি বড় কারণ হিসেবে সামনে আসে একাডেমিক পরিবেশের অবনতি। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার এবং পড়ালেখা, গবেষণা ও রিসার্চের উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষকদের একাডেমিক ভূমিকা আর রাজনৈতিক প্রভাব—এসব নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের তালিকাটাও বেশ লম্বা।

রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষতি

এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি করেছে বলেও আলোচনা রয়েছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হল ও ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত রাখা হয়েছিল সে সময়।

পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে বিগত দিনে ক্যাম্পাসে তৎকালীন প্রভাবশালী ছাত্রলীগের ভূমিকা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গিবাদ বিষয়ক পাঠদান নিয়ে অভিযোগ

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের জঙ্গিবাদবিষয়ক পাঠদান নিয়েও ড. জিয়া রহমান ও মনিরুল ইসলামকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট পাঠ ও আলোচনায় নামাজ, রোজা, পর্দা কিংবা দাড়ির মতো ইসলামি অনুশীলন ও দৃশ্যমান পরিচয়কে জঙ্গিবাদের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখানোর প্রবণতা ছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এভাবেই মেধাবী ও ধার্মিক শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে মেধাশূন্য করার এক অপচেষ্টা চালানো হয়েছে নানা সময়ে।

সব মিলিয়ে, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল মেধাবী তৈরির কারখানা, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই এখন মেধাশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগই উঠে আসছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।

এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারেন, গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষের পরিবেশ ফিরে আসে এবং মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়, তাহলে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের দরবারে আরও উন্নত মানে প্রকাশিত হবে বলে মত বিশ্লেষকদের।

একসময় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে হাঁটত দেশের ভবিষ্যৎ, আজ সেই করিডোরেই যদি মেধা, গবেষণা আর স্বপ্নের জায়গা সংকুচিত হতে থাকে—তবে সেটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বেগের সংকেত। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হারিয়ে যাওয়া সেই জৌলুস ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ সমুন্নত করার পাশাপাশি কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ার দাবি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের।