২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য পাঠ্যপুস্তকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর তৎকালীন একটি ঐতিহাসিক ডায়েরির ছবিও বইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এনসিটিবি জানিয়েছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম স্মৃতিকথা হিসেবে আলোচিত এই দলিলটিকে পাঠ্যভুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের পরিচিতিতে যা থাকছে
এনসিটিবির কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা জানান, নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য পাঠ্যপুস্তকের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিতি অংশে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চের গণহত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের জন্য তুর্যধ্বনির মতো ছিল।
প্রবন্ধটির মূল বর্ণনা শুরুর আগে দেওয়া ব্যাখ্যায় ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত একটি জাতির জন্ম এবং ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি নিবন্ধ দুটিকে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা
কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রবন্ধে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের বর্ণনা রয়েছে।
নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, জাতির সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে এসে দায়িত্ব নিতে হয়। নেতারা যখন উধাও হয়ে গিয়েছিলেন এবং সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ ছিল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে বড় সিদ্ধান্ত তাঁকে ঘোষণা করতে হয়েছিল। ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই সময় এসেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর তৎপরতার বর্ণনায় তিনি ১ মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধির কথা উল্লেখ করেন। ১৩ মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার গোলটেবিল বৈঠক শুরুর পাশাপাশি পাকিস্তানি জেনারেলদের একের পর এক বিমানে আসার কথাও নিবন্ধে রয়েছে।
নিবন্ধের বর্ণনা অনুযায়ী, ২৫ ও ২৬ মার্চের রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার জিয়াউর রহমানকে নির্দেশ পাঠান। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নৌবাহিনীর একটি ট্রাক পাঠানো হয়।
আগ্রাবাদের একটি ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থামলে মেজর খালিকুজ্জামান তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং ক্যান্টনমেন্টে হামলা ও শহরে অভিযান শুরুর কথা জানান। এরপর জিয়াউর রহমান উই রিভোল্ট বলে ষোলশহরে যাওয়ার এবং পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করার নির্দেশ দেন।
ষোলশহরে গিয়ে ব্যাটালিয়নের অফিসার ও জোয়ানদের একত্র করে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে নামার কথা জানান বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরই সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। সময়টি ছিল ২৬ মার্চ ১৯৭১ রাত ২টা ১৫ মিনিট।
পটিয়ার পাহাড়ে মুক্তাঞ্চল ও সম্মুখসমরের বর্ণনা
নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাত ৪টায় রেললাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে যাত্রা করেন জিয়াউর রহমান। পথে ইপিআরের একশ সদস্য তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। ২৬ মার্চের মধ্যেই তিনশ সদস্যের একটি বাহিনীকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় হানাদার বাহিনীর মোকাবিলার জন্য।
নিবন্ধে ওই সময়ের সম্মুখসমর এবং পাকিস্তানি শিবিরে আতঙ্ক ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনাও রয়েছে।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের স্মৃতিচারণ
কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার স্মৃতিচারণ করে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তিনি রেডিও স্টেশনে যান। সেখানে একটি এক্সারসাইজ খাতার পৃষ্ঠায় দ্রুত হাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লেখেন।
নিবন্ধ অনুযায়ী, ওই ঘোষণায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণের কথাও লেখা হয়েছিল। পরে বেতার তরঙ্গে সেই ঘোষণা প্রচারিত হয়।
জিয়াউর রহমানের বর্ণনায়, ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ঘোষণাটি প্রচারের পর বিশ্ববাসী বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যুদ্ধে নেমেছে—এ কথা শুনতে পায়।
এনসিসিসির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিবের সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, এনসিসিসির সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস জানতে পারবে।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরাও নিবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মত দিয়েছেন। জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধটির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ঘটনা জানার সুযোগ পাবে। তাঁর মতে, অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা করা হলেও বর্তমান সরকারের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার দৃষ্টিভঙ্গি সেই মানসিকতার অবসান ঘটাবে।
সূত্র: বাসস
আরও পড়ুন:







