শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোসহ আট দফা দাবিতে তপ্ত রোদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসিবুল হোসেন শান্ত। তিনি বলেছেন, তারা দুই বছর ধরে আন্দোলনের মধ্যে আছেন। এখন হয় বাঁচবেন, নয়তো দাবিগুলো বাস্তবায়ন হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে তাকে অবস্থান করতে দেখা যায়। এদিন তার অবস্থান কর্মসূচির তৃতীয় দিন। দাবি আদায়ে তপ্ত রোদে ছাতা মাথায় একাই বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।
আট দফা দাবি
জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন আন্দোলনের দাবিগুলো হলো—
১. সংস্কার কমিশন গঠন করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।
২. প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী শুধু শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার খরচ বিবেচনায় টিউশন ফি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে এবং আইনবহির্ভূত টিউশন ফি নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
৩. রিটেক ফি মূল কোর্স ফির অর্ধেক করতে হবে।
৪. প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংস্কার করে বেপরোয়া শিক্ষা-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, র্যাংকিং ও কার্যক্রম বিবেচনায় সরকার থেকে উন্নয়ন বরাদ্দ দিতে হবে।
৬. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটি গঠন করে গত দুই বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
৭. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে শিক্ষার্থী হয়রানি ও নির্যাতন এবং অন্যায়ভাবে তিন শিক্ষার্থীকে সাসপেন্ড করার দায়ে উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে।
৮. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যা, যেমন ওয়াই-ফাই, ক্যান্টিন ও ক্লাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীকে এ গ্রেড দেওয়াসহ শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।
টিউশন ফি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নিয়ে অভিযোগ
হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেন, জুলাই আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে তিনি সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জুলাইয়ের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীরা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন সমস্যা, দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করে কাজ করতে চেয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১২টি বিষয় চিহ্নিত করেছিলেন।
তিনি বলেন, পরে নাহিদদের সঙ্গে এসব বিষয়ে বসা হলেও তাদের কর্মকৌশলের সঙ্গে তারা আর সমন্বয় করতে পারেননি। একপর্যায়ে তারা আলাদা হয়ে যান। এরপর নতুন সরকার এলেও পরিবর্তনের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি তারা দেখছেন না।
শান্তের অভিযোগ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ লুটপাট এবং আইনবহির্ভূত টিউশন ফি ছিল তাদের অন্যতম দাবি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী শিক্ষার্থীর পেছনে যে ব্যয় হয়, তার আলোকে টিউশন ফি নির্ধারণের কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি টিউশন ফি নেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, এটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এই অতিরিক্ত অর্থ থেকে লুটপাট হচ্ছে।
তার ভাষ্য, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাষ্ট্র সব শিক্ষার্থীর শিক্ষার ব্যয় বহন করতে পারে না বলেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আইনবহির্ভূতভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এটি বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে শান্ত বলেন, জুলাইয়ের পর তারা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্বে আসেন। এরপর টিউশন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ তাদের অবস্থান ছিল টিউশন ফি কমানোর।
তিনি বলেন, গত ২৫ নভেম্বর তাকে প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়। সেখানে তিনি টিউশন ফি ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেন। জানুয়ারি থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ক্রেডিটের টিউশন ফি ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ৬ হাজার ৫০০ টাকা দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাভ করা সম্ভব। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নেই এবং এই অর্থ থেকে দুর্নীতি হচ্ছে।
তিন শিক্ষার্থীকে সাসপেন্ডের অভিযোগ
শান্ত বলেন, ১১ ডিসেম্বরের একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাকে আরও দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজনকে সাসপেন্ড করা হয়। তারা বিষয়টি জানতে পারেন এ বছরের ১৩ জানুয়ারি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিধি ও নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষার্থী প্ল্যাটফর্মের তিনি অ্যাডমিন ছিলেন। ওই গ্রুপে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কিছু লেখা হয়েছিল বলে তাকে দায়ী করে সাসপেন্ড করা হয়। কিন্তু ওই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই তাদের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে।
শান্ত জানান, ২৮ জানুয়ারি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে লিখিত আবেদন করেন। এরপর প্রায় আট মাস পার হলেও কোনো সমাধান হয়নি। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি চিঠি দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় তার কোনো জবাব দেয়নি। এরপরও ইউজিসির পক্ষ থেকে আর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ক্রেডিটের টিউশন ফি ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। এটিকে সম্পূর্ণ অবৈধ দাবি করে তিনি ২১ জুলাই আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠান। তাতেও সমাধান না হওয়ায় ৯ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরে আদালত রুল জারি করে কেন এই সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শাতে বলেন। ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও তারা রুলের কোনো জবাব দেয়নি।
সরকারের হস্তক্ষেপ চান আন্দোলনকারীরা
শান্ত বলেন, অন্যায় এখনো চলমান থাকায় তারা নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ চান। এ দাবিতে ৭ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিন দিনের সময় দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা অবস্থান কর্মসূচিতে বসেছেন। মঙ্গলবার তাদের অবস্থান কর্মসূচির তৃতীয় দিন।
কতদিন অবস্থান কর্মসূচি চালাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের বিষয়ে জানেন এমন অনেকেই আছেন। তারা সরকারের পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন। গত আট-নয় মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও তারা সমাধান পাননি।
হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেন, হয়তো বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে, যার মাধ্যমে দাবি বাস্তবায়ন হবে। হয়তো তিনি বেঁচেও নাও থাকতে পারেন। কারণ এই অন্যায় মেনে নিয়ে চুপ থাকার কোনো মানে নেই। দেশের পরিবর্তনের জন্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, তারা দুই বছর ধরে আন্দোলনের মধ্যে আছেন। এখন হয় বাঁচবেন, নয়তো এই দাবি বাস্তবায়ন হবে।
আরও পড়ুন:







