শনিবার

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

ঢাবির ভর্তিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:১০

আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:১০

শেয়ার

ঢাবির ভর্তিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (আন্ডারগ্রাজুয়েট) প্রোগ্রামে ভর্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানরা। এর পরেই রয়েছে কৃষক, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সন্তানরা। এছাড়া, বেসরকারি চাকরিজীবী, গৃহিনী (হাউজওয়ার্ক), সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক এবং সামরিক বাহিনীতে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে গত পাঁচ বছরে ভর্তি হওয়া ৩১ হাজার ৩৬১ জন শিক্ষার্থীর পিতার পেশাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১, ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছেন ব্যবসায়ীর সন্তানরা। শুধু ব্যতিক্রম দেখা যায় ২০২৪ সালে। ঐ বছর বেসরকারি চাকরিজীবী পরিবারের শিক্ষার্থীরা সংখ্যায় শীর্ষে থাকলেও পরের বছর আবারও ব্যবসায়ী পরিবার প্রথম অবস্থানে আসে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তথ্য শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের একটি ধারণা দিলেও, এসব তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে স্বচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার কারণে এখনো সব শ্রেণি-পেশার শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি সমান সুযোগ নিশ্চিত করছে।

প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথম বর্ষের আসন সংখ্যার ভিভিতে প্রায় ৬ হাজারের মতো শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৫৮৩ জনের পিতার পেশা ছিল ব্যবসা। এরপর কৃষক ছিলেন ৯০৯ জন, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ৮৪৮ জন, সরকারি (বেসামরিক) কর্মকর্তা-কর্মচারী ৬৮৮ জন, বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৪৯৯ জন, গৃহস্থালির কাজ (হাউজওয়ার্ক) ২৯১ জন, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ২৭৭ জন, শ্রমজীবী (চাকরিজীবী) ১২৬ জন, সামরিক বাহিনীর সদস্য ১১৪ জন এবং ১০৬ জনের পিতা ছিলেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এছাড়া, ৬৪৫ জন শিক্ষার্থী তাদের পিতার পেশা 'অন্যান্য' হিসেবে উল্লেখ করেছেন বা পেশার তথ্য প্রকাশ করেননি। এর বাইরেও কিছু পেশা উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী বছর ২০২২ সালেও স্নাতকের ভর্তিতে এগিয়ে ব্যবসায়ীদের সন্তানরা। সে বছর ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ হাজার ৩০২ জনের পিতার পেশা ছিল ব্যবসা। এরপর গৃহস্থালির কাজ (হাউজওয়ার্ক) ৬৪৮ জন, সরকারি (বেসামরিক) কর্মকর্তা-কর্মচারী ৬১১ জন, বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৫২৯ জন, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৩২৯ জন, শ্রমজীবী (চাকরিজীবী) ১০৮ জন, চিকিৎসক ৮২ জন, কৃষক ৪১ জন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পাঁচ জন, শিল্পী চার জন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী দুই জন এবং ফটোগ্রাফার ছিলেন এক জনের পিতা।

২০২৩ সালেও ব্যবসায়ী পরিবারের শিক্ষার্থীদের আধিপত্য বজায় ছিল। ঐ বছর ১ হাজার ৪২৪ জনের পিতার পেশা ছিল ব্যবসা। এরপর কৃষক ৭৫২ জন, বেসরকারি চাকরিজীবী ৬৭৫ জন, সরকারি (বেসামরিক) কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫৬২ জন, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৩১৪ জন, শ্রমজীবী (চাকরিজীবী) ১৭১ জন, সামরিক বাহিনীর সদস্য ৯৫ জন, স্বাধীন পেশার শ্রমজীবী ৮৭ জন, আইনজীবী ৭০ জন, চিকিৎসক ৫২ জন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ২৯ জন, গণমাধ্যমকর্মী ১৬ জন এবং প্রকৌশলী ছিলেন এক জনের পিতা। এছাড়া, ৩৯৭ জন শিক্ষার্থী পিতার পেশা অন্যান্য বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে ২০২৪ সালে আগের বছরের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। এ বছর সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী পরিবারের শিক্ষার্থীরা, যার সংখ্যা ৭৫০-এর বেশি। সে বছর মাত্র ৯৬ জন শিক্ষার্থীর পিতার পেশা ছিল ব্যবসা। এরপর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ৬৯১ জন, গৃহস্থালির কাজ (হাউজওয়ার্ক) ৫৯৬ জন, সরকারি (বেসামরিক) কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫৫৪ জন, বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৫২৮ জন, অন্যান্য ৪১০ জন, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৩২১ জন, সামরিক বাহিনীর সদস্য ১৪৪ জন, শ্রমজীবী (চাকরিজীবী) ৮৫ জন, স্বাধীন পেশার শ্রমজীবী ৭০ জন এবং ফটোগ্রাফার ছিলেন এক জনের পিতা।

পরবর্তী বছর ২০২৫ সালে তালিকায় আবারও শীর্ষে উঠে আসে ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানরা। সে বছর ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৩১৪ জনের পিতার পেশা ছিল ব্যবসা। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে বেসরকারি চাকরিজীবী ৭২৬ জন। এছাড়া, গৃহস্থালির কাজ (হাউজওয়ার্ক) ৬৩৯ জন, কৃষক ৬২১ জন, সরকারি (বেসামরিক) কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫৫৮ জন, বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক ৫৫৫ জন, শ্রমজীবী (চাকরিজীবী) ১১০ জন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩০ জন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ২৯ জন এবং দর্জি ২১ জন। আর পিতার পেশা অন্যান্য উল্লেখ করেছেন ৩৭৮ জন শিক্ষার্থী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ‘ঢাবিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের দেওয়া পিতার মাসিক আয়ের বিবরণীর তথ্যগুলোতে ভুল রয়েছে। হতে পারে ব্যবসায় বলা এখানে অনেকের পিতাই কৃষক। এছাড়া, অনেক শিক্ষার্থী আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পিতার আয় কম বলে উল্লেখ করে। তবে ফ্যাকালটি অনুসারে শিক্ষার্থীদের পারিবারিক তথ্য আলাদা হতে পারে বলে জানান এই অধ্যাপক। তার মতে, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের পরিবারের আয় ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পারিবারিক আয় বেশি।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি ইনক্লুসিভ যায়গা। যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সন্তানরা পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। আর এটির মূল কারণ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ত্রুটিহীন ভর্তি পরীক্ষাব্যবস্থা। একদম নিম্ন আয়ের কোনো পরিবারের শিক্ষার্থী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, পড়াশোনা শেষে সে আবার দেশের ভালো কোনো যায়গায় পৌঁছাতে পারে।’