মঙ্গলবার

২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩

ভারতের ভোটার তালিকায় নাম অথচ প্রধান শিক্ষক বাংলাদেশের বিদ্যালয়ের

সাগর মন্ডল বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩০

শেয়ার

ভারতের ভোটার তালিকায় নাম অথচ প্রধান শিক্ষক বাংলাদেশের বিদ্যালয়ের
ছবি বাংলা এডিশন

একটি পদ। পদটি প্রধান শিক্ষকের। অথচ সেই পদটিকে ঘিরেই যেন জন্ম নিয়েছে অভিযোগের পাহাড়। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নাম, নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অর্থ লেনদেন, অনুদানের অর্থে কারচুপি, অভিযোগের তালিকাটি যেন শেষ হওয়ার নয়। একের পর এক অভিযোগের তীরে জর্জরিত সেই পদের কর্ণধার।

অভিযোগ উঠেছে, তদন্তও হয়েছে। প্রতিবেদন হয়েছে, শোকজও দিয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও যখন অভিযুক্ত সেই ব্যক্তিকে দিব্যি প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়, তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, কোন অদৃশ্য বলয়ের শক্তিতে এখনো অটুট তার পদ?

খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক

খুলনার পাইকগাছার খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার। অভিযোগ উঠেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নম্বর বরশুল গ্রামের ১ নম্বর মনমোহন দে রোডের পশ্চিমাংশের ভোটার তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশে পাইকগাছার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটারও তিনি।

একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন

অভিযোগের পর পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন, গত (২৬ সেপ্টেম্বর) একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর ইউএনওর নির্দেশে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি (৩০ জানুয়ারি) আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেয় বলে তথ্য রয়েছে। অপরদিকে, ঠিক একই বছরের সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমানও বিষয়টি নিয়ে আরও একটি তদন্ত করেন বলে জানা যায়।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান বাংলা এডিশনকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে।

এছাড়াও চলতি বছরের (১ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ভারতের ভোটার তালিকায় দীপক চন্দ্র সরকারের পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব থাকার তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। কিন্তু দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের নাগরিকত্বের অভিযোগ উঠলেও কীভাবে তিনি এখনো স্বপদে বহাল আছেন এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বাংলা এডিশনকে বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্তে উঠে আসা বিষয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, খুলনায় প্রেরণ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও দাবি

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষাতেও উঠে আসে দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতের নাগরিক হওয়ার সত্যতা। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টিও সামনে এনে তার উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানায় তারা।

অন্যদিকে দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের নাগরিকত্বসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তিনি বাংলা এডিশনের কাছে সকল অভিযোগকে অস্বীকার করেন।

প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার বাংলা এডিশনকে বলেন, সকল অভিযোগ অস্বীকার করছি।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য

অন্যদিকে, পাইকগাছা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বজলুর রশিদ বাংলা এডিশনকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি।

অপরদিকে, পাইকগাছা উপজেলা মাধ্যমিক ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা রোকসানা পারভিনের বক্তব্যের মধ্যেও পাওয়া যায় দায়িত্বহীনতার গন্ধ। দীপক চন্দ্র সরকারকে শোকজ করার পর তার পক্ষ থেকে কোনো জবাব না আসায় তাকে হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি হাজির হয়েছেন কিনা, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

রোকসানা পারভিন বাংলা এডিশনকে বলেন, বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেখছেন বলে, তিনি এ বিষয়ে কোনো ধরনের ঘাটাঘাটি না করার কথা জানান।

কিন্তু বিপত্তি এখানেই। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কথা শুনে যোগাযোগ করা হয় খুলনা অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পরিচালকের সঙ্গে। দীপক চন্দ্র সরকারের বিষয়ে তিনিও কিছু জানেন না।

শিক্ষা পরিচালক আনিস আর রেজা বাংলা এডিশনকে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানি না।

প্রশ্ন উঠছে অদৃশ্য বলয় নিয়ে

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, দীপক চন্দ্র সরকারের কোনো অদৃশ্য বলয়ের শক্তিতে, কর্মকর্তারা বিষয়টিকে সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কি না?

দীপকের বিরুদ্ধে ওঠা ভারতের নাগরিকত্বের অভিযোগ এবং নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অর্থ লেনদেন, অনুদানের অর্থে কারচুপিসহ একাধিক স্পষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল আছেন, তা উদ্বেগের বিষয় এলাকাবাসীর কাছে। অপরদিকে, কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীন কথাবার্তাও তৈরি করেছে নানা ধোঁয়াশা। সবমিলিয়ে, দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে, সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার দাবি সবার।