বুধবার

১৯ আগস্ট, ২০২৬ ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩

“যাঁর আগমনে আলোকিত বিশ্ব: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)”

মোঃসিফাতুল্লাহ, শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:১৩

শেয়ার

“যাঁর আগমনে আলোকিত বিশ্ব: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)”
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র হিজরী বর্ষপঞ্জির রবিউল আউয়াল মাস আগমনের সাথে সাথেই বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক নবতর আধ্যাত্মিক বসন্তের আবাহন ঘটে। প্রাক-ইসলামী জাহিলিয়্যাতের ঘন অমানিশা দূর করে যে মহান সত্তার শুভ আগমনে ধরণী আলোকিত হয়েছিল, তিনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেন, “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি” (সূরা আল-আনবিয়া: ১০৭)। আজকের বিশ্ব যখন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধবিগ্রহ, সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় এবং পারস্পরিক বিদ্বেষে জর্জরিত, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনদর্শন পুনরুজ্জীবিত করা আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ধরাধামে শুভ আগমন কেবল ইতিহাস-উৎসারিত কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি মানব ইতিহাসের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া এক পরম মুহূর্ত। এ কারণে রবিউল আউয়াল মাস এলে এশিয়া থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূর প্রাচ্য—ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে কোটি কোটি মুসলিম একাত্ম হন নবীর প্রতি গভীর প্রেম ও শ্রদ্ধার অর্ঘ্য নিবেদনে। এই আনন্দ সমাবেশ কেবল আবেগীয় উপস্থাপন নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও সুন্নাহ চর্চার এক মহাসমারোহ।

আমাদের সমাজে 'ঈদে মিলাদুন্নবী' নামকরণ এবং 'ঈদ' শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে প্রায়শই অপ্রাসঙ্গিক বিতর্কের সৃষ্টি হতে দেখা যায়। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে এই বিতর্কের কোনো মজবুত ভিত্তি নেই। আরবী সাহিত্যের নির্ভরযোগ্য অভিধান ‘আল-মু'জামুল ওয়াসীত’ এবং ‘মু'জামুল গানী’ এর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, আরবী ভাষায় 'ঈদ' শব্দটির মূল ধাতু উদ বা আউদুন, যার অর্থ বারবার ফিরে আসা বা পুনরাবৃত্ত হওয়া1। পরিভাষায় এমন যেকোনো দিনকে 'ঈদ' বলা হয়, যা প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে আনন্দ, স্মৃতি ও তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসে।

ইসলামী শরীয়ত নির্ধারিত বার্ষিক দুটি প্রধান ওয়াজিব উৎসব (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা)-এর পাশাপাশি আভিধানিক ও সামাজিক বিচারে যেকোনো শুভ ও ঐতিহাসিক আনন্দময় স্মৃতির দিনকে 'ঈদ' হিসেবে আখ্যায়িত করা সম্পূর্ণ আরবী ভাষাসম্মত। ফলে 'ঈদে মিলাদুন্নবী' অর্থ দাঁড়ায় 'আল্লাহর নবীর জন্মোৎসবে আনন্দের বার্ষিক পুনরাবৃত্তি'। এটি আকীদাগত কোনো নয়া সংযোজন বা বিচ্যুতি নয়; বরং বিশ্বনবীর আগমনী নিয়ামতের প্রতি ভাষাগত ভালোবাসা ও শুকরিয়ার প্রকাশ।

ইসলামী আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ মিলাদুন্নবী উদযাপনের শরয়ী বৈধতার দলীল উপস্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য শরয়ী মূলনীতি (আছল) ব্যাখ্যা করেছেন হাদীস বিশারদ শায়খুল ইসলাম হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)। তিনি তাঁর বিখ্যাত ফাতাওয়া সংকলন ‘আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা’ (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৬)-এ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আশুরার হাদীস থেকে গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট দিনে অর্জিত বিশেষ নিয়ামতের জন্য প্রতিবছর সেই নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা শরীয়তসম্মত। তিনি যুক্তি দেন, আশুরার দিনে বনী ইসরাঈলকে ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দেওয়ার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের তুলনায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমন মানবজাতির জন্য নিঃসন্দেহে আরও মহান নিয়ামত। অতএব, এ মহান নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে তিলাওয়াত, দান-সদকা, সীরাত পাঠ ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে বাৎসরিকভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা প্রশংসনীয়।

একইভাবে ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.) তাঁর ‘আল-হাবী লিল ফাতাওয়া’ (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৬)-এ উল্লেখ করেন যে, নবীজি (সা.)-এর প্রতি সম্মান ও আনন্দ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়া, জিকির করা এবং মানুষকে খাবার খাওয়ানো—এসব কাজ এমন একটি প্রশংসনীয় নতুন রীতি (বিদআতে হাসানা), যার মাধ্যমে আমলকারী সওয়াব লাভ করতে পারে।

এমনকি আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-ও তাঁর ‘ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, মর্যাদা প্রদর্শন এবং উত্তম নিয়ত নিয়ে এ ধরনের আয়োজন করা হলে এর মাধ্যমে মহান পুরস্কার ও সওয়াব অর্জিত হতে পারে।

পবিত্র মিলাদুন্নবী উদযাপনের রূপরেখা আজ কেবল কোনো একক ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশে এই দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত [cite: officeholidays.com, en.wikipedia.org]। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কোসহ বিশ্বের অসংখ্য মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিনটি পালন করা হয় [cite: officeholidays.com, en.wikipedia.org]।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিচারে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দিনটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক দাতব্য কার্যক্রম, এতিমদের পোশাক দান, বিনামূল্যে খাবার বিতরণ (লঙ্গার) এবং দুস্থদের আর্থিক সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে বড় সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে ওঠে। এটি প্রমাণ করে যে মিলাদুন্নবী উদযাপন বিশ্বজুড়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক সংহতি বৃদ্ধির শক্তিশালী অনুঘটক।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে পবিত্র মিলাদুন্নবী উদযাপনকে কেবল আনুষ্ঠানিক আলোকময় সাজসজ্জা কিংবা মিষ্টান্ন বিতরণের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত মূল উদ্দেশ্য অধরা থেকে যাবে। আনন্দ প্রকাশের সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো সততা, ইনসাফ, আমানতদারী, কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে অবস্থান এবং মানবিক মূল্যবোধকে দৈনন্দিন জীবন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রফুল্লিত করাই হলো মিলাদুন্নবীর প্রকৃত শিক্ষা।

আমরা যদি আমাদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজে নবীর সুন্নাহ ও সুচরিত্রে রূপান্তর ঘটাতে পারি, তবেই আমাদের এই মিলাদ মাহফিল ও বাৎসরিক স্মৃতিচারণ সার্থক রূপ লাভ করবে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে বিশ্বনবীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উম্মাহর ঐক্য ও মানব কল্যাণে কাজ করার তৌফিক দান করুন।



banner close
banner close