সোমবার

১৭ আগস্ট, ২০২৬ ২ ভাদ্র, ১৪৩৩

এইচএসসিতে সাড়ে ১৩ লাখ আসন ফাঁকা, উচ্চশিক্ষায় সংকটের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৩৪

শেয়ার

এইচএসসিতে সাড়ে ১৩ লাখ আসন ফাঁকা, উচ্চশিক্ষায় সংকটের শঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

দেশের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য থাকা প্রায় ২৫ লাখ আসনের মধ্যে এবার প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন ফাঁকা থাকবে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীসংখ্যার এই ঘাটতির প্রভাব আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে উচ্চশিক্ষাতেও পড়তে পারে।

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। এর বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। ফলে সব পাস করা শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকবে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একাদশ শ্রেণিতে আসন খালি থাকার বিষয়টি শুধু কলেজ পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, প্রকৌশলসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে ভর্তি-প্রার্থীর সংখ্যাও কমতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংকট বেশি দেখা দিতে পারে।

তবে আসন খালি থাকার অর্থ এই নয় যে সমসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়বে। পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কারিগরি ও অন্যান্য শিক্ষায় যেতে পারে, কেউ বিদেশে পড়তে যেতে পারে, আবার কেউ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই পড়াশোনা চালিয়ে নাও যেতে পারে। একইভাবে যারা বর্তমানে পাস করেছে, তাদের সবাই যে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় যাবে, এমনটিও নয়।

দুই বছর পর প্রভাব পড়তে পারে উচ্চশিক্ষায়

২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। এরপর তাদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে। ফলে এবারের এসএসসি পাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব উচ্চশিক্ষায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে ২০২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষে।

এতে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আসন খালি থাকার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে কম চাহিদার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় বিষয় এবং জেলা পর্যায়ের কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসনের তুলনায় শিক্ষার্থীর চাহিদা বেশি থাকায় শিক্ষার্থীসংখ্যা কিছুটা কমলেও ভর্তি প্রতিযোগিতা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

শুধু আসন নয়, শিক্ষার্থী কমে যাওয়াই বড় প্রশ্ন

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষার আসন কম কি না, তার চেয়ে ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

একাদশ শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকতে পারে। এ অবস্থায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নতুন বিভাগ বা অতিরিক্ত আসন তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষার মান ও বিষয়ভিত্তিক চাহিদা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।

তবে শুধু এক বছরের এসএসসি ফলের ওপর ভিত্তি করে দেশে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। আগামী কয়েক বছরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোন দিকে যায়, সেটিই মূল বিষয়।

‘শরীরের মাপ অনুযায়ী জামা-কাপড় কাটতে হবে’

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, এত আসন ফাঁকা থাকার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তার ভাষায়, শরীরের মাপ অনুযায়ী জামা-কাপড় কাটতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সবাই সাধারণ শিক্ষায় যাবে এমন নয়। কারিগরি শিক্ষায় যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। তার মতে, রাজধানীর ভালো কলেজগুলোতে ভর্তি নিয়ে চাপ বাড়লেও দুর্বল কলেজগুলো শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে।

উচ্চশিক্ষায় প্রভাবের বিষয়ে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, এই শিক্ষার্থীরাই উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। তখন শিক্ষার্থী আরও কমে যেতে পারে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা যত্রতত্র গড়ে উঠেছে। চাহিদাভিত্তিক কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সে বিষয়ে একটি শুমারি হওয়া উচিত।

‘এটা ভালো, তবে মূল্যায়ন দরকার’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, এবার সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। তার মতে, এটি ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, অতীতে কোনো হিসাব-নিকাশ ছাড়াই স্কুল-কলেজ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে এইচএসসির জন্য কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ঘাটতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একইভাবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী ঘাটতি হবে কি না জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এর প্রভাব পড়বে না। তবে দুর্বল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংকট তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক অভিলাষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণও যথাযথভাবে করা হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। ফলে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে।

‘ছাত্র সংকটে পড়বে দুর্বল কলেজগুলো’

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, স্কুল-কলেজের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত বছরও প্রায় অর্ধেক আসন ফাঁকা ছিল বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, যেখানে কেউ ভর্তি হবে না, সেখানে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কলেজে ভর্তি হবে। তবে দুর্বল কলেজগুলো ছাত্র সংকটে পড়বে।

উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর অনেক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সামর্থ্য নাও থাকতে পারে। এ কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকটের কথা বলা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন খালি থাকার প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস পরপর ভর্তি ও সেমিস্টার পদ্ধতি চালু রয়েছে।

সমাধানের বিষয়ে অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, অতীতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জরিপ করে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হলে একাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একীভূত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি বহাল রেখেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

সব মিলিয়ে, একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার বিষয়টি আপাতত কলেজ পর্যায়ের বড় একটি বাস্তবতা। তবে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব ২০২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষাতেও দৃশ্যমান হতে পারে। বিশেষ করে দুর্বল ও কম চাহিদার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।



আরও পড়ুন:

banner close
banner close