বুধবার

১২ আগস্ট, ২০২৬ ২৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

যৌন নিপীড়ন কি শুধু মাদ্রাসাতেই হয়?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:৫১

আপডেট: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:৫৩

শেয়ার

যৌন নিপীড়ন কি শুধু মাদ্রাসাতেই হয়?
ছবি বাংলা এডিশন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটা যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের বড় অংশই নাকি কওমি বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘটছে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি এমন দাবি করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থার কিছু পরিসংখ্যান ও সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদন জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের।

মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক অবক্ষয় যখন অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেসব নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই। তাহলে কি শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে টার্গেট করেই এই সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে? অন্যদিকে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কমিটি কেন শুরুতেই কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে সালিশের মাধ্যমে তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে, তা নিয়েও উঠছে যৌক্তিক প্রশ্ন।

ডয়চে ভেলের দাবি ও পরিসংখ্যান

ডয়চে ভেলের সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট হিসাব রাখলেও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক আলাদা কোনো পরিসংখ্যান তারা রাখে না। এরপরও তাদের পর্যবেক্ষণ, বিদ্যাপীঠগুলোতে ঘটা যৌন হয়রানির অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে মাদ্রাসায়। সংস্থাগুলোর অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চার শতাধিক এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যার অর্ধেকের বেশি শিশু ও কিশোরী। শুধু জুলাই মাসেই প্রায় একশ নারী ও শিশু এর শিকার হয়েছেন।

আরেকটি সংস্থার হিসাবে, গত বছর দেশে সাড়ে সাত শতাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যার প্রায় অর্ধেকই ছিল শিশু। তাদের মতে, আবাসিক সুবিধা, অভিভাবকদের নজরদারির অভাব এবং ধর্মের ভয় দেখিয়ে এসব অপরাধ ধামাচাপা দেয়া হয়। ডয়চে ভেলে তাদের দাবির পক্ষে বেশ কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে এক ছাত্রকে টানা বলাৎকারের পর অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে বোঝাতেন সে 'স্বপ্ন দেখছে'। চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে এক এতিমখানার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আট বছরের এক শিক্ষার্থীকে ওয়াশরুমে নিয়ে নিয়মিত বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া নেত্রকোনা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ঘটা অনুরূপ ঘটনার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনায় মেয়েদের পাশাপাশি ছেলে শিক্ষার্থীরাও উদ্বেগজনক হারে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ বিষয়ে কাজ করা এক গবেষকের মতে, বিচারহীনতার কারণে সেখানে এক ধরনের শিশুকাম বা পেডোফিলিয়া প্রবৃত্তি গড়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা এখানে পড়তে আসে বলে অভিভাবকরা খোঁজ রাখে না, আর সেই সুযোগটাই নেয় অপরাধীরা।

পাল্টা প্রশ্ন ও অপপ্রচারের অভিযোগ

তবে, ডয়চে ভেলের এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। তাদের মতে, বর্তমান সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছেলে-মেয়েদের 'ফ্রি মিক্সিং' বা অবাধ মেলামেশার কারণে নৈতিক স্খলন এক নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

দেশজুড়ে ধর্ষণ, ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে আপসের মাধ্যমে একে স্বাভাবিক রূপ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার এই ভয়াবহ অবক্ষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো কেন নীরব? অনেকেরই প্রশ্ন, সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ঘটে চলা অপরাধ নিয়ে সমাজ কেন নীরব? কেন কেবল উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে?

বিশ্লেষকরা বলছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও, এর পেছনে এক ধরনের সুকৌশলী অপপ্রচার কাজ করছে। মূলত দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে জনসম্মুখে হেয়প্রতিপন্ন করতেই এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহার।

এমনকি ডয়চে ভেলের প্রকাশিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হারুন ইজহার। এছাড়া, মেইনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যমে, ফ্যাসিবাদি আমল থেকেই ইসলামকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এটিকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীলদের 'কাঠামোগত অপপ্রচার' বলে দাবি করা হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসার বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের ঘটনা সামনে আসে। সেক্ষেত্রে, পক্ষপাতিত্ব বা ধামাচাপা না দিয়ে, প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানান মুফতী হারুন ইজহার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র একপক্ষকে দোষ না দিয়ে বিষয়টিকে সার্বিক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। সাধারণ স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে মাদ্রাসা, সব জায়গাতেই শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একপেশে প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে কালিমালিপ্ত করার সূক্ষ্ম এজেন্ডা যেমন বন্ধ হওয়া প্রয়োজন, তেমনই যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীদের বাঁচানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে, দেশের সব বিদ্যাপীঠে নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন করার দাবিও তুলেছে সংশ্লিষ্টরা।



banner close
banner close