শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) চালু করা হয়েছিল সেন্ট্রাল স্মার্ট আইডি (আরএফআইডি) কার্ড। লাইব্রেরি, চিকিৎসা কেন্দ্র ও আবাসিক হলের সেবা একটি কার্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত করা, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে ক্যাশলেস পদ্ধতিতে ফি প্রদানের সুবিধা চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই কার্ড এখন কোনো কাজেই ব্যবহার করতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রকল্প হাতে নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বছর আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহজাহান আলীকে আহ্বায়ক করে স্মার্ট আইডি (আরএফআইডি) কার্ড প্রস্তুত কমিটি গঠন করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহকে সভাপতি করে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেই সময় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শাহজাহান আলী জানিয়েছিলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ক্যাম্পাস গঠনের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভাগ, হল, লাইব্রেরি ও চিকিৎসা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই কার্ড ব্যবহার করে ক্যাশলেস পদ্ধতিতে ফি প্রদানের ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনার কথা বলা হয়।
তবে বাস্তবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা খুব একটা দেখা যায়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে কেবল ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর হাতে কার্ড তুলে দেওয়া হয়। কার্ড বিতরণের পরপরই বিভিন্ন অসংগতির অভিযোগ ওঠে। এক শিক্ষার্থীর কার্ড স্ক্যান করলে অন্য শিক্ষার্থীর তথ্য দেখানোর ঘটনাও সামনে আসে। এছাড়া আরএফআইডি প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজ না করার অভিযোগও করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের কার্ড দেওয়া হলেও বাকি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্ড বিতরণের কার্যক্রম আর দৃশ্যমান হয়নি।
বর্তমানে সেন্ট্রাল আইডি কার্ড থাকলেও শিক্ষার্থীদের হল, চিকিৎসা কেন্দ্র ও লাইব্রেরির সেবা নিতে আলাদা আলাদা কার্ড ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সালেহ আহমেদ বলেন, “চিকিৎসা নিতে মেডিকেলে গেলে ডাক্তার মেডিকেল কার্ড চান। তখন আমি সেন্ট্রাল আইডি কার্ড দেখিয়ে বলি, এই কার্ড দিয়েই তো সব সেবা নেওয়ার কথা। পরে তিনি বলেন, ‘এবার দিচ্ছি, এরপর এসে এই সেন্ট্রাল কার্ডের গল্প এখানে শোনাবে না।’'
তিনি আরও বলেন, লাইব্রেরিতেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। “দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ইবি এখনো সনাতনী পদ্ধতির বাইরে বের হতে পারছে না,” যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মেডিকেল কার্ডে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়। শুধু একটি কার্ড দিয়ে সেটি পুরোপুরি সম্ভব নয়। আরএফআইডি কার্ড চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে এটি কার্যকর করা সম্ভব হবে।”
লাইব্রেরি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেন্ট্রাল আইডি কার্ড কার্যকর করার বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান আব্দুল মজিদ বলেন, “লাইব্রেরি কার্ডের জন্য নেওয়া একশ টাকা লাইব্রেরির উন্নয়নেই ব্যয় করা হয়। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন যথাযথ যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল। সেগুলো নিশ্চিত করা গেলে লাইব্রেরিতেও এই সেবা চালু করা সম্ভব।”
হল প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক জালাল উদ্দীন বলেন, “এখানে মূলত সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এখনো সব শিক্ষার্থী এই সেবার আওতায় আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই একই কার্ডের আওতায় এলে সেবাটি কার্যকর করা সহজ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এত দেরি কেন হচ্ছে, সেটি আমার জানা নেই।”
অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহজাহান আলী বলেন, “মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হয়, তাই সেখানে আলাদা কার্ডের প্রয়োজন থাকতেই পারে। মেডিকেলে হয়তো আমরা পুরোপুরি এই কার্ড কার্যকর করতে পারবো না।”
সমন্বয়হীনতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা যখন কার্ড নিয়ে যাচ্ছেন, তখন সবাই জানেন যে একটি সেন্ট্রাল আইডি কার্ড চালু হয়েছে। লাইব্রেরি কার্ডের ফি সিন্ডিকেট কর্তৃক নির্ধারিত। এই প্রকল্পে প্রথম দিকে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, পরে আরও কিছু অর্থ খরচ হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, প্রশাসনও সহযোগিতা করবে বলে আশা করছি।”
আরও পড়ুন:



.jpg)




