দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক অস্থিরতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী দ্বন্দ্ব, ভিসি অপসারণের দাবি এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বর্তমানে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, শাটডাউন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার ঘটনা ঘটছে। এতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে দেশের অন্তত পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। কোথাও পদত্যাগ দাবি, কোথাও প্রশাসনিক অনিয়ম, আবার কোথাও নিয়োগ ও পদোন্নতি জটিলতা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’
পদোন্নতি জটিলতার সমাধান না হওয়ায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সোমবার থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষকরা। এতে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকেও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল উপাচার্য, বিভাগীয় কমিশনার এবং শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সংকটের সমাধান হয়নি। পরে ৯ মে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভাতেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আন্দোলন আরও জোরদার হয়।
পবিপ্রবিতে সংঘর্ষ, অনির্দিষ্টকালের বন্ধ ঘোষণা
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের অপসারণ দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষক ও কর্মকর্তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ড. মো. শওকত আলীর পদত্যাগ দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়।
তবে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের উপস্থিতিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময় ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ভিসি সংঘর্ষ
সম্প্রতি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের সঙ্গে সাদা দলের শিক্ষকদের হাতাহাতি ও বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, উপাচার্যের নেতৃত্বে তাঁদের ওপর হামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে উপাচার্য দাবি করেন, একদল শিক্ষক তাঁর কক্ষে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং হামলা চালান।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
রাঙামাটি ও জামালপুরেও অস্থিরতা
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামে শাখা ছাত্রদল। নিয়োগে অনিয়ম ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অবমাননার অভিযোগ তুলে উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা দেওয়া হয়। পরে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করা হয়।
অন্যদিকে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগে ভিসি ও প্রোভিসির পদত্যাগ দাবিকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
এ ছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায় ভিসি-প্রোভিসি ও শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সম্প্রতি প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টর পদত্যাগ করেছেন।
ভিসি পরিবর্তনে সরকারের তৎপরতা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রায় দেড় ডজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পরিবর্তনের বিষয়ে কাজ চলছে। ধাপে ধাপে এসব পরিবর্তন আনা হবে। ঈদের আগেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
সূত্র অনুযায়ী, প্রথম ধাপে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া, পবিপ্রবি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তন আসতে পারে।
এ ছাড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, নতুন ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করছেন শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টারা।
ইউজিসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চলমান সংকটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকট দেখা দিলেও ইউজিসির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দলীয়করণ, নিয়োগ ও পদোন্নতি জটিলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা বাড়ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের পটভূমি ও রাজনৈতিক বিভাজনও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ বা পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে কোনো দাবিকে কেন্দ্র করে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, “শিক্ষকদের যদি কোনো দাবি থাকে, তাহলে তাঁরা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসে তা জানাতে পারেন। সরকার বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করবে।”
আরও পড়ুন:








