রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীবের দায়িত্বকালে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। ৫৫৭ দিনের মেয়াদে ১৫টি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে অন্তত ৪৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মেধা উপেক্ষা, নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন, বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ এবং দলীয় প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সাবেক প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ১৫৪ জন শিক্ষক, ছয়জন চিকিৎসক, তিনজন কর্মকর্তা এবং ৩১৫ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। অল্প সময়ে এত বিপুল নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
উর্দু বিভাগের একটি শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। এ নিয়োগে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থী এ সালামকে বাদ দিয়ে প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানপ্রাপ্তদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। এ ঘটনায় নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল চূড়ান্ত ফলাফলে স্বাক্ষর করেননি। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট নিয়োগ অনুমোদন দেয়। গত ২৪ এপ্রিল এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ভুক্তভোগী প্রার্থী।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠে এসেছে। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া এক শিক্ষকের পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পরিবর্তন করে একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিভাগে একটি শূন্য পদের বিপরীতে ১০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়।
কর্মকর্তা নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বছরের ৩ মার্চ জনসংযোগ দপ্তরে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অ্যাডহক ভিত্তিতে এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই আইসিটি সেন্টারে একজনকে সহকারী প্রোগ্রামার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয়। আরেকজনের ক্ষেত্রে সনদ দেখাতে না পারায় পরবর্তীতে নিয়োগ বাতিল করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ছয়জন চিকিৎসককে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন জানান, জরুরি নিয়োগের বিধান থাকলেও তা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হওয়া উচিত ছিল।
নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। এক প্রার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে একটি ফোনালাপের অডিও সামনে আসে, যা পরে ফরেনসিক পরীক্ষায় সত্য বলে প্রমাণিত হয়। এ ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে ৩১৫ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে নিজের শ্বশুরকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং সবকিছু মেধার ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈনউদ্দিনও দাবি করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কিছু নিয়োগে নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে অভিযোগ এলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামগ্রিকভাবে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মেধার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:






.jpg)

