প্রান্তিক এলাকার মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রায় ২ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকার নেক্সট জেন প্রকল্প হাতে নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। তবে বৈদেশিক ঋণনির্ভর এই প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে অতিরঞ্জিত ব্যয়, পরিকল্পনাগত অসংগতি এবং সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটি এখনো একনেকে অনুমোদন পায়নি এবং আজ তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মাউশি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি প্রথমে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায় প্রস্তাব করা হলেও পরবর্তীতে তা কয়েক দফা সংশোধন করে শুধু এডিবির ঋণের ২ হাজার ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও এখনো অনুমোদন মেলেনি।
প্রকল্পের লক্ষ্য প্রান্তিক অঞ্চলের ৪৯৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৮৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, বিজ্ঞানাগার ও আইসিটি সুবিধা বৃদ্ধি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ইউনিক আইডিভিত্তিক ডাটাবেইস এবং ই-লার্নিং কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তিনটি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে প্রতিটি স্কুলে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল কর্মকর্তাদের মতে, একই কাজ ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। এ কারণে এই খাতে কয়েকশ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ৫৪ জনের তালিকা করা হয়েছে, যেখানে ৩৯ জন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং শিক্ষক রয়েছেন ১৫ জন। এক ধাপে কোনো শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষকদের মধ্য থেকে প্রশিক্ষণে ভালো করা ব্যক্তিদের বিদেশে পাঠানোর কথা থাকলেও কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে তিনি অবগত নন এবং এটি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নির্ধারিত হয়েছে।
প্রকল্পে সফটওয়্যার ও ই-লার্নিং কনটেন্ট তৈরিতে ৭২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ডাটা সংরক্ষণে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে এসব ডাটা সংরক্ষণে কোনো পৃথক পরিকল্পনা বা বাজেট না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে তা অকার্যকর হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে মোট ৪৪৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণের সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো নির্ধারিত হয়নি। যানবাহন ভাড়ার জন্য বরাদ্দ থাকার পরও আলাদাভাবে যাতায়াত ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ফার্নিচার ও ল্যাব সরঞ্জাম খাতে অস্পষ্ট বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন জানান, প্রকল্প প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের যুগ্মসচিব মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, প্রস্তাবটি অনুমানভিত্তিক এবং পরিকল্পনা কমিশন বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করবে। কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করা হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, প্রকল্পে অবকাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। তিনি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার ওপর জোর দেন এবং প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের প্রবণতা থেকে সরে এসে কার্যকর পরিকল্পনার আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও স্বচ্ছতা, ব্যয় যৌক্তিকতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
আরও পড়ুন:








