রবিবার

১২ এপ্রিল, ২০২৬ ২৯ চৈত্র, ১৪৩২

দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষ শিক্ষকের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:২২

শেয়ার

দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষ শিক্ষকের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ
ছবি: এআই জেনারেট

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো প্রকাশিত সর্বশেষ বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক স্তরে গড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিক্ষক নির্ধারিত ন্যূনতম দক্ষতার মান পূরণ করেছেন, যা আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের দক্ষতা নির্ধারণে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে—প্রথমত, সংশ্লিষ্ট স্তরে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে কিনা এবং দ্বিতীয়ত, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা সেই স্তরের জন্য উপযোগী কিনা। এ মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হার ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ।

একই সূচকে মালদ্বীপ সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হার ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ভুটান, নেপাল, ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান যথাক্রমে দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে এবং প্রতিটি দেশই এ সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে।

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতির পেছনে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া সনদের মাধ্যমেও শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এছাড়া বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় অসংগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরিত তালিকায় প্রকৃত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না পাঠিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না এবং শ্রেণীকক্ষে তার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত মান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এবং পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলার মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষক সংকট শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয় পড়াতে হচ্ছে, যা শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ১৬ দশমিক ৯৯ শতাংশের ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। একইভাবে গণিতের ক্ষেত্রে এ হার ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে।

শিক্ষাবিদদের মতে, পরিস্থিতি উত্তরণে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি, নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা এবং শ্রেণীকক্ষে তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।



banner close
banner close