রাজশাহীতে ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ হত্যার মূলহোতা হিসেবে করা অভিযোগকে উদ্দেশ্যেমূলক ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্র বলে বিবৃতি দিয়েছেন সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার।
গত শনিবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ জনতার গণধোলাইয়ের শিকার হন শহরের বিনোদপুর এলাকায়। গণধোলাইয়ের পরে কতিপয় স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থী থানায় নিয়ে আসে মাসুদকে। তখন থানায় অবস্থান করছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অর্ধ শতাধিক শিক্ষার্থীরা । যারা ঐ দিন বিকেলে পঞ্চবটী মন্দিরে ধর্ষনের পর হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সানি ও কটাকে জব্দ করে পুলিশের নিকট সোপর্দ করে।
এ সময়ে অটোরিকশায় মাসুদকে আনা হলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তাকেও ধর্ষনে জড়িত সন্দেহে আক্রমণে উদ্যত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাবি শাখার সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে এগিয়ে যান অটোরিকশার দিকে এবং নিরাপত্তার সঙ্গে গুরুতর আহত মাসুদকে থানা ভবনে ওঠাতে সহায়তা করেন পুলিশকে।
মাসুদকে আনায়ন ও সোপর্দের পুরো বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছে বাংলা এডিশন। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মাসুদের অবস্থা গুরুতর লক্ষ্য করে প্রশাসন তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ মৃত্যুবরন করেন ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ।
মাসুদের মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমে প্রচার হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে একের পর এক আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ থেকে বিবৃতি আসতে থাকে।
ঘটনাস্থলে আম্মারের উপস্থিত থাকার ভিডিওটিকে উপজীব্য করে আওয়ামী লীগের মিডিয়া সেলসহ বিভিন্ন স্তরের নেতারা সালাউদ্দিন আম্মারকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে বিবৃতি দিয়েছেন। বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনও আম্মারকে হত্যাকারী হিসেবে সামনে এনে একটি কার্ড শেয়ার করেন নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে।
এমনকি সজীব ওয়াজেদ জয়ও আজ ভোরে তার ভেরিফাইড পেজে আম্মারকে খুনী পরিচয় করিয়ে দিয়ে পোস্ট করেন। তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেন- জানা গেছে, শিবির ক্যাডার ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার এই হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সুস্পষ্ট করতে সোমবার দুপুরে ফেইসবুকে বিবৃতি দিয়েছেন আম্মার। বিবৃতিতে আম্মার বলেছেন-
‘দেশ স্বাধীন হলো। মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। সেটা শুধু অপরাধীর বিরুদ্ধ্বেই না,একজন নিরাপরাধ কেও যেনো মিডিয়া ট্রায়ালের সামনে আনা না হয়।
টার্গেট করে একজন কে দোষ দিয়ে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করা যায়। প্রকৃত দোষী কে সেইটা আসলেই বের হয় না। আওয়ামীলীগের মিডিয়া সেল কি সত্যিই চায় মাসুদ হত্যার বিচার হোক? নাকি রাজনৈতিক ফায়দাতে পুরাতন কায়দায় চেতনার ব্যবসা বাণিজ্য খুলে বসা।
আমি আম্মার,সেদিন বোয়ালিয়া থানাতে ঘটনাক্রমে আমি উপস্থিত ছিলাম দুইজন অভিযুক্ত ধর্ষককে নিয়ে। সেই সময় ঘটনার শেষে মাসুদ ভাইকে আনা হয়।বমতিহার থানা থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে শুনেছি। কিছুই জানিনা,এমন একটা ঘটনাতে মিডিয়া ট্রায়াল সত্যিই অনেক বেশি কষ্টের। বোয়ালিয়া থানাতে প্রচণ্ড আহত অবস্থায় আসে মানুষটা,সেখানে সবাইকে আমি নিবৃত করি।এভাবে আসলে টার্গেট হলে মানুষের বিপদে কেউ আগাবেনা। কারণ সবাই ভাববে যাকে সাহায্য করা হচ্ছে সেই আহত মানুষের কিছু হলে সাহায্যকারীই ফেসে যাবে। আমি হয়তো একজন আহত মানুষকে হেল্প না করে দূরে থাকতে পারতাম,ভিডিও তে আমার ছবি আসতো না,কিন্তু অসহায় মানুষটা থানাতে মার খেতো অলরেডি প্রচণ্ড আহত হয়ে কে বা কারা তাকে থানায় নিয়ে এসেছিলো। আমার অপরাধ সে অটো থেকে নামার সময় আমি তাকে বাচাতে গেছি।
আমাকে টার্গেট করে আসলে কি মাসুদ ভাইয়ের বাচ্চা মেয়েটা বিচার পাবে? নাকি মিডিয়া সেলের কৌশলই বিচার না করে জিনিসটাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে ফেলা। আমি চাই এই হত্যার বিচার হোক। টার্গেট করা হলে প্রকৃত অপরাধী কিন্তু বের হবেনা।
বিনোদপুরে অনেকেই বলছে এমন ঘটনা নাকি ঘটেনি,মতিহারের সিসিটিভি ফুটেজ চেয়ে সাংবাদিকেরা ফোন দিলে কাউকে পায়নি।তাহলে কে করলো ঘটনা? কারা জড়িত এর সাথে?
আমাকে নিয়ে আওয়ামী ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। আন্দোলনের শুরু থেকে একের পর এক চক্রান্তের ভয়াবহ নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। বলা যায় রাজশাহীতে তাদের গলার সবচেয়ে বড়ো কাটা আমিই ছিলাম এবং এখনও আছি।
তবে আমার এ যাত্রা অনন্তকালের এবং খুব ভালো করেই জানি আমাদের মতো আন্দোলনকারীদের জীবন কখনো মসৃণ হয়না। এই তিক্ত সত্য মাথায় নিয়েই জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাজপথে নেমেছি। যতো ভয়ানক হোক, আমি সব পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত।
তবে এটা ভেবে ভালো লাগছে যে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রটি এখন আমাকে নিয়ে হচ্ছে! এই যাত্রায় যদি আমার কিছু হয়েও যায়, তবু বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না। বরং পিলখানার সেনা অফিসার, রানা প্লাজার নিরীহ মানুষ, আবরার ফাহাদ, আবু সাইদ, মুগ্ধ, সাকিব আনজুম, আলী রায়হানসহ বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিজমের ভয়াল থাবায় যারা নির্মম বলি হয়েছেন, নিজেকে তাদের যোগ্য উত্তরসূরী বলেই মনে করবো।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিপাত যাক,হত্যা নিয়ে দলীয় রাজনীতি বন্ধ হোক। এত এত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা, অন্যের অপরাধে সুবিধাজনক টার্গেটকে বলি না দেয়া হোক।আসুন আমরা আওয়াজ তুলি,আসুন আমরা বিচার চাই,সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করি।’
আরও পড়ুন:








