বৃহস্পতিবার

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪ কার্তিক, ১৪৩৩

ডিএসইতে শ্রমিক না থাকলেও ডব্লিউপিপিএফের ৩২ কোটি টাকা নিলেন কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০৭

শেয়ার

ডিএসইতে শ্রমিক না থাকলেও ডব্লিউপিপিএফের ৩২ কোটি টাকা নিলেন কর্মকর্তারা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোনো শ্রমিক না থাকলেও শ্রমিকদের জন্য গঠিত ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) থেকে গত ছয় অর্থবছরে ৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের অর্থে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই তহবিলের অর্থ নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ নিয়ে অনিয়ম ও তহবিল গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ডিএসইর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে এই তহবিল গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায় পরিচালন লোকসান থাকলেও সুদ আয় থেকে পাওয়া মুনাফার ওপর তহবিল গঠন করে কর্মকর্তাদের অর্থ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে শেয়ারহোল্ডাররা পাচ্ছেন সামান্য লভ্যাংশ।

ছয় বছরে তহবিলে ৩২ কোটি টাকার বেশি

ডিএসইর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডব্লিউপিপিএফে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯ কোটি ২ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ছয় বছরে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

ডিএসইতে বর্তমানে ৩৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো আয় করতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শেয়ারহোল্ডারদের সংকট, কর্মকর্তাদের বাড়তি সুবিধা

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেছেন, শ্রমিক না থাকায় ব্যাংকগুলো ডব্লিউপিপিএফ গঠন করেনি। অথচ ডিএসই উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের এই তহবিলের অর্থ দিচ্ছে। মূল ব্যবসায় মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পরও এমন বরাদ্দ যৌক্তিক নয়। তাঁর মতে, ডিএসইর শেয়ারহোল্ডাররা বর্তমানে দুরবস্থার মধ্যে রয়েছেন।

ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উচ্চ বেতনের পাশাপাশি বিনা সুদে গাড়ি ও বাড়ির ঋণসুবিধা পান। এ ছাড়া গাড়িচালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধাও রয়েছে তাঁদের। এরপরও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ থেকে পাওয়া সুদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে ডব্লিউপিপিএফের অর্থ দেওয়া হচ্ছে।

ওই পরিচালক আরও বলেন, ডিএসইর মালিক শেয়ারহোল্ডাররা আর্থিক সংকটে ভুগছেন। অর্থসংকটের কারণে কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি কিছু ব্রোকারেজ হাউজও বন্ধ হয়ে গেছে।

মন্তব্য দিতে চাননি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বুধবার সকালে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। ফোনের রিং হলেও তিনি ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে মন্তব্য চাওয়া হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি জবাব দেননি। তবে ডিএসইর এক পরিচালকের মাধ্যমে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন না বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

একই দিন রাতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।

পরিচালন লোকসান ৪৯ কোটি টাকা

ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় ছিল ১০১ কোটি ৩ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় হয় ১৫০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এতে পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

একই অর্থবছরে এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ড-বিল থেকে সুদ আয় হয়েছে ৯৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের অর্থে অর্জিত এই সুদ আয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকার ডব্লিউপিপিএফ গঠন করা হয়।

ওই সুদ আয় করতে ডিএসইকে ৫৭৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এফডিআর ও ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ছিল ২৩৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএসইর নিট মুনাফা হয়েছে ৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৭ পয়সা। সুদ আয় না থাকলে প্রতিষ্ঠানটিকে লোকসান গুনতে হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনের ব্যত্যয় দেখছেন অর্থনীতিবিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেছেন, পরিচালন মুনাফা হলে ডব্লিউপিপিএফ গঠন করতে হয়। পরিচালন মুনাফা না থাকলে সুদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে এই তহবিল গঠন করা আইনের ব্যত্যয়। সুদ আয় করতে কর্মকর্তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাই ওই আয়ের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের জন্য তহবিল গঠন করা ঠিক নয়। বিষয়টি ডিএসইর শেয়ারহোল্ডারদের বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ডিএসইর প্রতিষ্ঠা ও মালিকানা কাঠামো

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয় লেনদেনব্যবস্থা চালু করে। পরে ২০১৩ সালে এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন প্রণয়নের পর একই বছরের ২১ নভেম্বর ডিএসই ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও লেনদেনের সদস্যপদ পৃথক করার কাঠামো তৈরি হয়। ২০১৮ সালে চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হয়।

ডিএসইর পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৮০৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সুদ আয় থেকে মুনাফা হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত মুনাফা বা রিটেইনড আর্নিংসের পরিমাণ ৭৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসার বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের ১ দশমিক ৭০ শতাংশ হারে, অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা লভ্যাংশ দিয়েছে ডিএসই।