সরকারি সতর্কবার্তা ও অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। অক্টোবরে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়। ফলে প্রতি সিলিন্ডারে ক্রেতাদের ৩৬৩ থেকে ৪৬৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। সরবরাহ ও এলাকাভেদে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থের পরিমাণ আরও বেশি।
বাড্ডার বাসিন্দা নাজমুল শিকদার ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে আয় করেন। সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। এলপিজির বাড়তি দাম তার আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
নাজমুল জানান, মাসের শুরুতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। এতে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪৬৩ টাকা বেশি খরচ হয়েছে তার। বাড়তি এই টাকা কার পকেটে যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, বাজারে সবজির দাম কমপক্ষে ৮০ টাকা। কয়েক দিন আগে তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে। গত পাঁচ-ছয় মাসে গ্যাসের দামও অনেক বেড়েছে। ফলে তার মতো মানুষের জন্য সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ধানমন্ডির বাসিন্দা সাদিয়া আক্তারও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ১৭ অক্টোবর ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে ২ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। এলপিজির অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে বলে খবরে দেখেছেন তিনি। তবে বাস্তবে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় সরকারি পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাদিয়া।
সরবরাহ নিয়ে বিক্রেতা ও আমদানিকারকদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এলপিজির দাম বাড়ার কারণ নিয়ে খুচরা বিক্রেতা ও আমদানিকারকদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে আমদানিকারকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) বলছে, দেশের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। তাই সরবরাহের ঘাটতির অজুহাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই।
হাতিরপুলের এলপিজি বিক্রির প্রতিষ্ঠান আনাস এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ সোহেল বলেন, কোম্পানিগুলোর কাছে যত সিলিন্ডার চান, তার অর্ধেকেরও কম পান তিনি। সিলিন্ডার আনতে গাড়ি নিয়ে কোম্পানির কাছে যেতে হয় এবং পাঁচ দিন পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। তারপরও চাহিদার অর্ধেক সিলিন্ডার পাওয়া যায় না।
সোহেলের ভাষ্য, পরিবহন ও কর্মীদের খরচও অনেক বেশি। এ অবস্থায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা কঠিন। জুন ও জুলাইয়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে এলপিজি বিক্রি হয়েছিল। পরে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
খুচরা বিক্রেতাদের আরও অভিযোগ, কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি চালানে উল্লেখ করা দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছে।
এ বিষয়ে ফ্রেশ এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, বর্তমানে বাজারে মাত্র ১০ থেকে ১৩টি কোম্পানি এলপিজি সরবরাহ করছে। অথচ তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৫০টি। বাকি কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবরাহ না করায় তাদের সিলিন্ডার পড়ে আছে। ফলে বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখা কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
রাজা বলেন, সরবরাহের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা দাম নিয়ে কারসাজি করতে পারেন। তবে বাজারের সংকটের জন্য শুধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালে বিইআরসি এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশন সর্বশেষ নির্ধারণ করেছিল। পরিবহনসহ বর্তমান খরচের সঙ্গে ওই কমিশনের হার সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা কমিশনের পর্যালোচনা করা উচিত।
পর্যাপ্ত আমদানির দাবি এলওএবির
এলপিজি সরবরাহে ঘাটতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। ১ অক্টোবর প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
এলওএবির বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কোনো অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করলে কিংবা নিয়ম ভেঙে মজুত করলে তা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।
৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জেলা প্রশাসকদের অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সরকার সতর্ক করে জানায়, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রচলিত আইনে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনার পরও নির্ধারিত দামে এলপিজি কেনা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের দাবিতে বিক্রি বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার
এলপিজি ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধসহ কয়েকটি দাবিতে এলপিজি বিজনেস কোঅপারেটিভ অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। পরে জ্বালানিমন্ত্রীর সতর্কবার্তা এবং বিইআরসির গণশুনানি আয়োজনের আশ্বাসের পর সংগঠনটি কর্মসূচি প্রত্যাহার করে।
ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পরিবেশকদের কমিশন বাড়ানো, কোম্পানিগুলোর ইচ্ছামতো মাসে একাধিকবার দাম বাড়ানো বন্ধ করা এবং দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিইআরসির সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলকভাবে মানা। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডারে আবার গ্যাস ভরার অনুমতি দেওয়া এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আরোপ করা অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। বেসরকারি খাতের এলপিজি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং অন্যান্য খরচের ভিত্তিতে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করা হয়।
আরও পড়ুন:







