রবিবার

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ৩ কার্তিক, ১৪৩৩

বাংলাদেশের চার খাতের উন্নয়নে ৩৯০ কোটি টাকা দিচ্ছে কানাডা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৪৬

শেয়ার

বাংলাদেশের চার খাতের উন্নয়নে ৩৯০ কোটি টাকা দিচ্ছে কানাডা
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের উন্নয়নে চারটি উদ্যোগে ৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান ঘোষণা করেছে কানাডা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা। বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডা, কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনাল, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) মাধ্যমে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) ঢাকার কানাডীয় হাইকমিশন এ তথ্য জানিয়েছে। হাইকমিশন জানায়, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরকালে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই এ অনুদানের ঘোষণা দেন।

সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং দুই দেশের জনগণের জন্য উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করা। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ, গবেষণা কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।

চার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যয় হবে অনুদান

ঘোষিত অনুদানের মধ্যে বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডাকে দেওয়া হবে ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডিয়ান ডলার। কানাডার কৃষি খাতের উদ্ভাবকদের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

একই পরিমাণ অর্থ, অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডিয়ান ডলার পাবে কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনাল। এ অর্থের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সহজ করা, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন এবং কানাডাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কারে অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংককে দেওয়া হবে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার। অন্যদিকে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইএফসিকে দেওয়া হবে ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার।

প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক

বাংলাদেশ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে বৈঠক করেন রণদীপ সারাই।

বৈঠকগুলোতে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশ, কানাডা ও অন্যান্য অংশীদারের যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা।

দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য গবেষণায় সহায়তা

সফরের অংশ হিসেবে ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী। সেখানে কানাডার সহায়তায় তরুণ-তরুণীরা, বিশেষ করে নারীরা, কীভাবে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন, তা দেখেন তিনি।

কানাডা, ব্র্যাক ও অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে এ উদ্যোগে ৪ কোটি ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার সহায়তা দিয়েছে কানাডা।

ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) হাসপাতাল পরিদর্শনকালে কানাডার সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের অবদান সম্পর্কেও অবগত হন প্রতিমন্ত্রী। এসব গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সাশ্রয়ী ও জীবনরক্ষাকারী সমাধান তৈরি হচ্ছে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখো মানুষের উপকারে আসছে। এসব উদ্ভাবনের সুফল কানাডাতেও পৌঁছেছে।

বর্তমানে আইসিডিডিআর,বির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় কানাডা ১ কোটি ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলার অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া কানাডাই একমাত্র দেশ, যারা প্রতিষ্ঠানটিকে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এ ছাড়া যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা ও ঘাটতি নিয়ে গবেষণার জন্য আইসিডিডিআর,বিকে আরও ২ কোটি ৪০ লাখ কানাডিয়ান ডলার সহায়তা দিয়েছে দেশটি।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা

বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে গিয়ে নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রণদীপ সারাই। সেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য কানাডার সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি অবগত হন তিনি।

২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য ৬০ কোটি কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে কানাডা। এ সহায়তা শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণে অবদান রাখছে।

কক্সবাজারে সফরকালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, কানাডা ও আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টা এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব আলোচনায় উঠে আসে।

কৃষি ও তৈরি পোশাক খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) একটি প্রদর্শনী কেন্দ্রও পরিদর্শন করেন রণদীপ সারাই। সেখানে গবেষণাভিত্তিক কৃষি কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকেরা কীভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, খাদ্যের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করছেন, তা প্রত্যক্ষ করেন তিনি।

বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে উদ্ভাবনী পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সিমিট বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডার সঙ্গে কাজ করবে।

সফরের অংশ হিসেবে ঢাকায় গিলডান অ্যাকটিভওয়্যার বাংলাদেশ লিমিটেডও পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কানাডার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এ সময় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে কানাডার উন্নয়ন সহায়তা ৬৩০ কোটি ডলারের বেশি

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং শরণার্থী সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কানাডার সহযোগিতামূলক কার্যক্রম বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে ৬৩০ কোটি কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে কানাডা।

পাশাপাশি ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় নতুন এ অনুদান দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে কানাডা।

এর মাধ্যমে দুই দেশের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সম্পদ কাজে লাগিয়ে নতুন সুযোগ সৃষ্টি, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সফর শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই।