শনিবার

১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২ কার্তিক, ১৪৩৩

ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৯ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৬:৪৪

শেয়ার

ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৯ কোটি টাকা
ছবি সংগৃহীত

চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় আগের ছয় মাসের তুলনায় ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলোর এ খাতে ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের সিএসআর কার্যক্রম পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেশে কার্যরত ৬১টি তপশিলি ব্যাংকের ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে অন্যান্য খাতে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২৯ দশমিক ১১ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা

অন্যান্য খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। এ উপখাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য উপখাতে ৫ কোটি ৮৩ লাখ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ, অবকাঠামো উন্নয়নে ২ কোটি ২ লাখ এবং আয়-উৎসারী কার্যক্রমে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপখাতের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের শীতপ্রধান অঞ্চলের শীতার্ত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণের জন্যও অর্থ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সহায়তায় ব্যয়

স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকগুলোর সিএসআর অর্থ ব্যয় হয়েছে মূলত হতদরিদ্র, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, ক্লিনিক্যাল সেবা, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণে।

এ ছাড়া বিভিন্ন দুরারোগ্য ও জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সরাসরি অনুদান দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ, পরিচালন ব্যয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দিয়েছে।

শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ

চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নেও এ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

তবে ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ফলে আগের ছয় মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতে জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগের ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে ব্যয় কমেছে ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

এ খাতে বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিবেশবিষয়ক গবেষণা, মৎস্যজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সহায়তার মতো কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অবদান ৮৭ শতাংশের বেশি

ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী, সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। দেশের ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩৩টি ব্যাংক জানুয়ারি-জুন সময়ে এ খাতে ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এটি ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৮৭ দশমিক ১১ শতাংশ।

দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ছয়টি ব্যাংক ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা মোট ব্যয়ের ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ছয়টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে দুটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ১১ লাখ টাকা।

ইসলামি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ অন্যান্য উৎসের

জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় হয়েছে ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এটি ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এর মধ্যে আগের বছরে অর্জিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা। বাকি ১৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা এসেছে নিট মুনাফা ছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে। অর্থাৎ ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে।

অন্যদিকে, দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ছয়টি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিএসআর খাতে মোট ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে অর্জিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে এসেছে ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে মাত্র ৮ লাখ টাকা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর ব্যয় ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা

ব্যাংকের পাশাপাশি দেশে কার্যরত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের সিএসআর কার্যক্রমও পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট সিএসআর ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৭৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা ৩০ দশমিক ৫১ শতাংশ। পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা বা ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে সিএসআর কার্যক্রমে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় অংশের অর্থ ব্যয় হয়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক সিএসআর ব্যয় আগের ছয় মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।