নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। বাজার খরচ, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল এবং যাতায়াত ব্যয় মেটাতে গিয়ে কমছে সঞ্চয়। বাড়তি খরচ সামলাতে অনেকেই বিনোদন, ভ্রমণ ও ভবিষ্যতের জন্য জমানো অর্থের খাত সংকুচিত করছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই চাপ ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, ভোগ ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। সরকারি পরিসংখ্যানেও জাতীয় সঞ্চয়ের হার ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে। একই সময়ে জিডিপিতে বিনিয়োগের হারও কমেছে, বিপরীতে বেড়েছে ভোগ ব্যয়।
কমছে জাতীয় সঞ্চয়ের হার
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
চলতি মূল্যে অর্থনীতির আকার বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে সঞ্চয়ের হার বাড়েনি। বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে মানুষের সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমছে।
জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের জন্য অর্থের জোগানেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ের ওপর এর প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে পণ্য ও সেবা খাত থেকে অর্জিত আয় থেকে দেশের জনগণ ও সরকারের মোট ভোগ ব্যয় বাদ দিলে অবশিষ্ট অর্থকে দেশজ সঞ্চয় বলা হয়। দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং বিদেশি খাত থেকে অর্জিত আয় যুক্ত হয়ে জাতীয় সঞ্চয় নির্ধারিত হয়।
বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত তিন অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশ হয়েছে। কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি। বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিনিয়োগ কমেছে।
বিনিয়োগের এই নিম্নমুখী প্রবণতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের আয় ও সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে গেলে অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। টানা তিন মাস ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি থাকার পর জুলাই ও আগস্টে তা কমেছিল। সেপ্টেম্বরে আবারও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, গত মাসের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাবে বাজারে শাকসবজি, মাছ ও মাংসের দাম চড়া রয়েছে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি বাড়লেও জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। সেপ্টেম্বরে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে পণ্যমূল্য যে হারে বেড়েছে, মজুরি বেড়েছে তার চেয়ে কম। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও চাপে পড়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, বাড়ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এ সময়ে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট আউটলুক প্রকাশ করেছে আইএমএফ।
প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দেশের প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
অর্থনীতির দুর্বলতার প্রভাব তাই প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আরও পড়ুন:







