সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। সরবরাহ সংকটের কথা বলে বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ গত মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় বেশি। আমদানি বাড়ার পরও বাজারে ঘাটতি কেন, আর নির্ধারিত দামের বাইরে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ কার কাছে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাজার তদারকিতে জরুরি বৈঠক
এলপিজির বাজার তদারকি করতে আজ রবিবার (১১ অক্টোবর) সকালে জরুরি বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, বৈঠক থেকে সরাসরি আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলা হবে। সমস্যা কোথায় তৈরি হচ্ছে, তাও দেখা হবে।
অন্যদিকে এলপিজি ব্যবসায়ী মালিক সমিতি লিমিটেড নামে ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন সোমবার (১২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের কমিশন আরও বাড়াতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও ১০০ টাকা অতিরিক্ত কমিশন দাবি করা হবে।
সরবরাহ সংকটের কথা বলে বাড়তি দাম
বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় কোম্পানি থেকে ডিলার, এরপর খুচরা ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে এলপিজি গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। অভিযোগ রয়েছে, সরবরাহ সংকটের কথা বলে ডিলাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মুনাফা যোগ করে তা বিক্রি করছেন। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা।
রবিবার (৪ অক্টোবর) এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়, অর্থাৎ বেড়েছে ২৫২ টাকা। আগেও সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হতো না। এখন দাম বাড়ানোর পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি দাম চাওয়া হচ্ছে। কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা, কোথাও আবার সিলিন্ডার নেই বলে জানাচ্ছেন বিক্রেতারা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) কাঠালবাগানের খুচরা ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, তখন তাঁর দোকানে সিলিন্ডার ছিল না। রাতে সিলিন্ডার আসতে পারে, তবে দাম পড়বে ২ হাজার ৩০০ টাকা। দাম বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজারে সিলিন্ডার নেই এবং তাঁকেও বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করলে ব্যবসা চলবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, ক্রেতারা এসে ঘুরে যাচ্ছেন এবং অন্য কোথাও কমে পেলে গ্রাহক সেখান থেকে নিতে পারেন।
পশ্চিম ধানমন্ডির সোনালী এন্টারপ্রাইজ নামের একটি দোকানের কর্মী বলেন, তাঁরা ডিলারদের কাছে যে পরিমাণ চাইছেন, ডিলাররা তা দিতে পারছেন না। ডিলারদের কাছেও পরিমাণে কম থাকায় তাঁরা দাম কিছুটা বাড়িয়ে বলছেন। দোকানমালিকদের ব্যবসা চালাতে হবে বলে তাঁরা ডিলারদের কথায় রাজি হয়ে যতটা পারছেন, ততটা সিলিন্ডার নিয়ে নিচ্ছেন। ওই কর্মীর ভাষ্য, নিয়মিত ক্রেতাদেরও গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁরাও বেশি দামেই নিতে চাইছেন। তাই মালিককেও বেশি দাম দিয়েই সিলিন্ডার আনতে হচ্ছে।
আমদানি বাড়লেও সরবরাহ কম কেন
এলপিজির বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) থেকে। বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, ওই সময়ের পর থেকে আমদানিকারকরা বাজারে সরবরাহ কমিয়েছেন। কমিশনের কাছে ১১টি কোম্পানি বিক্রির তথ্য দিয়েছে। সেসব তথ্য অনুযায়ী, মাসের শুরুতে বিক্রি বেশি থাকলেও শেষের দিকে তা কমেছে। কোনো কোনো কোম্পানি মাসের শেষ দিকে বিক্রি বন্ধ রেখেছে বলেও অভিযোগ আছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অক্টোবরের শুরুতে দাম বাড়তে পারে, এমন ধারণা থেকে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি বাজারে ছাড়েননি কোনো কোনো অপারেটর। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর আগের কয়েক মাসে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন। আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কেন এবং নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ কারা নিচ্ছে, এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মিলছে না।
আমদানিকারকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, জাহাজভাড়া ও আমদানির প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। বেসরকারি অপারেটর টিএমএসএস এলপিজির এজিএম আনিসুর রহমান বলেন, ঠিক সময়ে চালান আসা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক কোম্পানি বাধ্য হয়ে রেশনিং করছে। তবে বাজারে একেবারেই গ্যাস নেই, এমন ধারণা ঠিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
খুচরা পর্যায়ের বাড়তি দামের বিষয়ে আনিসুর রহমান বলেন, কোম্পানি ডিলারদের কাছে সিলিন্ডার দেওয়ার পর খুচরা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডার বিক্রি করেন। সেখানে কী দামে বিক্রি হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা কোম্পানিগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বড় তিন কোম্পানির সরবরাহে ঘাটতি
এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বসুন্ধরা এলপিজি, বেক্সিমকো এলপিজি ও ইউনিগ্যাসের আমদানি ও বিতরণ কার্যক্রম আগের মতো সচল নেই। বাজারসংশ্লিষ্টদের দাবি, একসময় এই তিন কোম্পানির সম্মিলিত বাজার শেয়ার ছিল অন্তত ৪০ শতাংশ। কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফা করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্দেশনা থাকলেও কার্যকর হচ্ছে না
বাজারে সংকট দেখা দেওয়ার পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জ্বালানিমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বাজারে সংকট নেই বলে জানানো হয়। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বিবৃতি দিয়ে বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশনা দেয়। পরে জ্বালানিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
তবে নির্দেশনা ও সরকারি পদক্ষেপের পরও বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আমদানি, সরবরাহ ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় বাড়তি অর্থের সুবিধাভোগী শনাক্ত করা এবং বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন:







