দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প একসঙ্গে তিন ধরনের চাপে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাড়ছে খরচ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামে পণ্য নেওয়ার চাপ দিচ্ছেন। পাশাপাশি ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
টেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান তুহিনের মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ক্রেতারা পণ্যের দাম কমানোর চাপ দিচ্ছেন। পশ্চিমা বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা আগের তুলনায় কম দামে পোশাক কিনতে চাইছেন। এতে রপ্তানিকারকদের মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে।
অর্ডার ধরে রাখাই বড় উদ্বেগ
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাম্প্রতিক জরিপে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানা জানিয়েছে, বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার কমিয়েছে বা বাতিল করেছে।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ৮৭ শতাংশ কারখানা পণ্য পাঠাতে বিলম্বের মুখে পড়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে ক্রেতাদের আস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ড সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে। এতে বাংলাদেশের কিছু অর্ডার অন্য দেশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের সব পোশাকের অর্ডার ব্যাপকভাবে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ক্রেতারা সরবরাহকারী নির্বাচনে বৈচিত্র্য আনছেন এবং বিকল্প দেশগুলোর সক্ষমতা যাচাই করছেন।
জ্বালানি সংকটে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
বিকেএমইএর জরিপে ৭৮ শতাংশ নিট পোশাক কারখানা জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা জানিয়েছে।
গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতাও কমছে।
বাড়তি ব্যয় ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত। মূল্যস্ফীতি ও অতিরিক্ত মজুদের কারণ দেখিয়ে ব্র্যান্ডগুলো কম দামে পণ্য কিনতে চাইছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এখন পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানা সময়মতো সরবরাহ করতে পারছে না। এর প্রভাব অর্ডার, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর পড়ছে।
তিনি জানান, ক্রেতারা এখন দামের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে অর্ডার ধরে রাখা কঠিন হবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও কমেছে রপ্তানি
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪৯৬ কোটি ডলার থেকে কমে প্রায় ৪৬৫ কোটি ডলারে নেমেছে।
তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও কমেছে। চীনের রপ্তানিতে বড় পতন হয়েছে। ফলে সংকুচিত বাজারে বাংলাদেশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাবের সভাপতি ও সিপিডির সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, চীনের হারানো বাজারের পুরো সুবিধা বাংলাদেশ নিতে পারেনি। ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াও কিছু ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
তার মতে, বৈশ্বিক বাজার সংকুচিত হলেও প্রতিযোগিতা কমছে না। সীমিত বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘ লিড টাইম এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বাজার হিস্যা ধরে রাখা কঠিন হবে।
কারখানা বন্ধ হলেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি
চাপের মধ্যেও পোশাক খাতে কর্মসংস্থানের চিত্র পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন কারণে ৩০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার শ্রমিকের চাকরি গেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে ৫৩টি নতুন কারখানা বিজিএমইএর সদস্যপদ পেয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ২৪ হাজার কর্মী কাজ করছেন। অর্থাৎ কিছু কারখানা বন্ধ হলেও নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোই বড় পরীক্ষা
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পোশাক খাতের বর্তমান চাপ শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে নয়। বৈশ্বিক চাহিদা, ক্রেতাদের মূল্যচাপ, উচ্চ সুদহার, লজিস্টিকস ব্যয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সক্ষমতা—সবগুলো বিষয় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়িয়ে লিড টাইম কমানো প্রয়োজন। দীর্ঘ মেয়াদে কম খরচের পোশাক উৎপাদনের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তু, উচ্চমূল্যের পোশাক ও নতুন পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগও জোরদার করা দরকার।
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধায় কিছু পরিবর্তন আসবে। তাই উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর এখন থেকেই গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আরও পড়ুন:







