বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি শ্লথ, দারিদ্র্য বাড়ছে, স্থবির কর্মসংস্থান: বিশ্বব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৩৩

আপডেট: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৩৫

শেয়ার

বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি শ্লথ, দারিদ্র্য বাড়ছে, স্থবির কর্মসংস্থান: বিশ্বব্যাংক
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতার মতো অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

তবে সরকার দ্রুত সাহসী সংস্কার পদক্ষেপ নিলে এবং জ্বালানিসংকট দূর হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে মিডিয়া ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা ও নাজমুস সাদাত খান বক্তব্য দেন।

প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতের এটি প্রথম সংকোচন।

অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো নারীদের অনেকে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টানা চার বছর বেড়েছে দারিদ্র্য

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর বড় অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং সচ্ছল পরিবারেরাও এসব সুবিধার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা অনেক মানুষ সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় এ হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পাস করাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রাজস্ব কম, বাড়ছে চলতি ব্যয়

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে কর-রাজস্ব প্রায় ৭ শতাংশ।

সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে আছে। করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার কাজও কার্যকর হয়নি।

সংস্কারে তিন খাতে অগ্রাধিকার

ব্যাংক খাতে সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও অন্য অংশীজনদের লোকসানের দায় বহন এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুৎ কেনায় স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে আনার সুযোগ

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে সরকারের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির মাত্র ৫৪ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষ পাচ্ছে। অর্থাৎ বড় অংশ চলে যাচ্ছে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র নয় এমন জনগোষ্ঠীর কাছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খাদ্যসংক্রান্ত একাধিক ভর্তুকি একত্রিত করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির উন্নত টার্গেটিংয়ের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সমন্বয় করা গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।