বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ব্যয়, তবু কাটছে না গ্যাস-সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৩২

আপডেট: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৩৩

শেয়ার

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ব্যয়, তবু কাটছে না গ্যাস-সংকট
ছবি সংগৃহীত

গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও দেশের গ্যাস-সংকট পুরোপুরি কাটছে না। শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কোথাও সরবরাহ কম, আবার কোথাও চাপ এতটাই কম যে উৎপাদন চালানো কিংবা রান্নার চুলা জ্বালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এতে একদিকে সরকারের জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস-সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ার মাশুল গুনছেন উদ্যোক্তারা। বাসাবাড়িতেও ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তুলনামূলক বেশি দামের খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এতে ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক সরবরাহে বাধা, ভাসমান টার্মিনালের সমস্যা এবং জরুরি মজুতের ঘাটতি আমদানিনির্ভর গ্যাস সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।

তিন মাসে এলএনজিতে ব্যয় ৩৬ হাজার কোটি টাকা

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজিতে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ৩০ কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসের এলএনজি আমদানিতেই প্রায় এক বছরের ভর্তুকির সমপরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে।

গত অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি ছিল ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যয় হয়েছে আগের পুরো বছরের ভর্তুকির প্রায় ৭১ শতাংশ।

একই হারে ব্যয় চলতে থাকলে বছরে এলএনজিতে ভর্তুকির প্রয়োজন ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক দাম, আমদানির পরিমাণ ও চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের পরিবর্তনের কারণে বছরের মোট হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের প্রয়োজন জানিয়ে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংশোধিত বাজেটের আগে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, বছরের বাকি সময়ে আমদানির আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও আলোচনা করা হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে এবং শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লে এ জ্বালানির দামও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪১ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

চুক্তির তুলনায় স্পট মার্কেটে ব্যয় বেশি

তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে এলএনজি কেনার স্পট মার্কেটে দাম দ্রুত পরিবর্তিত হয়। যুদ্ধ বা সরবরাহে বাধা তৈরি হলে আমদানিকারক দেশগুলোকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির আগে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ মার্কিন ডলারে কিনত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই দাম বেড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে।

চলতি অক্টোবরের জন্য কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দাম পড়েছে প্রায় ২৭ থেকে ২৯ ডলার। একই সময়ে কিছু স্বল্পমেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ২৫ দশমিক ২৬ থেকে ২৫ দশমিক ৩৫ ডলার।

স্পট মার্কেটের তুলনায় চুক্তিভিত্তিক কেনাকাটায় খরচ কম হলেও ক্রয়ের সময়, সরবরাহের শর্ত ও দামের সূত্র ভিন্ন হওয়ায় সব কার্গোর ক্ষেত্রে একই ধরনের সাশ্রয় ধরে নেওয়া যায় না। কম দামের নির্ধারিত সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়।

এর পাশাপাশি কার্গো দেশে পৌঁছালেও টার্মিনালে কারিগরি বা পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিলে সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ফলে বেশি অর্থ ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্পট থেকে কেনাকাটা কমানোর পরিকল্পনা

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে। এ জন্য বিশ্বব্যাপী অপেক্ষাকৃত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

তবে বড় কোনো সরবরাহকারী প্রতিশ্রুত কার্গো দিতে না পারলে আবার বেশি দামের স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটা বাড়াতে হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে বর্তমানে এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকলেও আগামী বছরের শুরুতে চুক্তির আওতায় আবার আমদানি শুরু করা যাবে বলে আশাবাদী জ্বালানি বিভাগ।

এদিকে স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটা কমানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। গত ২৯ আগস্ট সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের শেষ সময় প্রথমে ১৫ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ২২ সেপ্টেম্বর, ৬ অক্টোবর এবং সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারীকে অন্তত একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং ন্যূনতম ৫ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। একক প্রতিষ্ঠান বা যৌথ উদ্যোগে আবেদন করা যাবে। আগে থেকেই তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না।

গ্যাস-সংকটে কমছে শিল্পের উৎপাদন

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর একাধিক ব্যবসায়িক নেতা জানিয়েছেন, এলএনজি আমদানির ব্যয়ের পাশাপাশি গ্যাস-সংকটের আর্থিক চাপও বহন করছে শিল্প খাত। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতির কারণে পোশাক খাতের উৎপাদন একপর্যায়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল।

কারখানাগুলোকে বারবার উৎপাদন পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানির পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো নিটওয়্যার কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অনেক কারখানায় কয়েক ধাপে কাজ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।

তবে এসব তথ্য নির্দিষ্ট কারখানার পরিস্থিতির বর্ণনা। পুরো শিল্প খাতের উৎপাদন একই হারে কমেছে—এমন কোনো হিসাব এতে নেই।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় উৎপাদনে বড় সমস্যা বা এলএনজি আমদানিতে বাধা তৈরি হলে সরবরাহ ২২৫ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুটেও নেমে আসে।

গ্যাস না পেলে কিছু কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ে। উৎপাদন কমলেও কারখানার অনেক স্থায়ী খরচ অপরিবর্তিত থাকে। ফলে কম পণ্যের ওপর ওই খরচ ভাগ হওয়ায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানির প্রতিযোগিতা, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। এ ছাড়া খুচরা দাম অপরিবর্তিত রেখে স্থানীয় পণ্যের আকার ও পরিমাণ কমিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে অনেক কোম্পানি।