মঙ্গলবার

৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২০ আশ্বিন, ১৪৩৩

যাত্রী বেড়ে দ্বিগুণ, তবু পিংক বাসে দৈনিক ভর্তুকি ৬০ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৮

শেয়ার

যাত্রী বেড়ে দ্বিগুণ, তবু পিংক বাসে দৈনিক ভর্তুকি ৬০ হাজার টাকা
ছবি সংগৃহীত

নারীদের যাতায়াতের জন্য চালু করা পিংক বাস সার্ভিসে এক মাসের ব্যবধানে যাত্রীসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে যাত্রী বাড়লেও ভাড়া থেকে আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় সরকারকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কর্মদিবসে চলাচল করা এই বাসের অধিকাংশ যাত্রী কর্মজীবী নারী ও ছাত্রী। অফিস সময়ের বাইরে বেশিরভাগ বাস অনেকটাই ফাঁকা থাকছে।

বিশেষায়িত এই নারী বাস সার্ভিস চালু হয় ১৮ আগস্ট। শুরুতে প্রতিদিন যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৬০০। এক মাসের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনে পৌঁছেছে। যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকা ভাড়া আদায় হলেও সরকারকে একই সময়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

বিআরটিসি সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে রাজধানী, বগুড়া ও চট্টগ্রামের ১৩টি রুটে ১৪টি পিংক বাস নামানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল বাস, বগুড়ার দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং চট্টগ্রামের একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করছে।

সার্ভিস চালুর পর ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ দিন বাসগুলো চলেছে। এ সময়ে মোট ট্রিপ হয়েছে ২৭২টি। বাসগুলোতে প্রায় ২১ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছেন। গড়ে প্রতিদিন যাত্রী ছিল ১ হাজার ৪০ জন।

সার্ভিস চালুর প্রথম সপ্তাহে যাত্রীসংখ্যা হাজারের নিচে থাকলেও পরে তা বাড়তে থাকে। ২০ দিনে ভাড়া বাবদ আয় হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। গড়ে প্রতিদিন আয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। একই সময়ে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।

বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানান, সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটের মধ্যে বাসগুলো ছেড়ে যায়। ঢাকায় বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টা এবং বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুপুর ১টা ও বিকাল ৩টার দিকে বাস চলাচল করে। যাত্রী না পাওয়ায় দিনের বড় একটি সময় বাসগুলো ডিপোতে অলস পড়ে থাকে।

যাত্রী ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ স্টপেজ ও সময়সূচি নিয়ে

পিংক বাস উদ্বোধনের সময় বিআরটিসি জানিয়েছিল, ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৬টি স্পট থেকে যাত্রী ওঠানামা করানো হবে। তবে অনেক যাত্রীর অভিযোগ, অপেক্ষমাণ যাত্রী না দেখলে নির্ধারিত স্টপেজেও বাস থামছে না। ফলে নিয়মিত যাত্রী ছাড়া অন্যরা বাসে উঠতে পারছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, নারী চালকেরা এখনো প্রতিটি স্টপেজে দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করতে পারেননি। অন্য বাসকে পাশ কাটিয়ে প্রতিটি স্টপেজে বাস দাঁড় করাতে হয়। অভিজ্ঞতা কম থাকায় নারী চালকেরা আপাতত এই ঝামেলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তবে ধীরে ধীরে তারাও এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।

যাত্রীদের ভাষ্য, বাস ছাড়ার সময় এবং কোন স্টপেজে কখন পৌঁছাবে, তার নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি না থাকায় অনেকে পিংক বাসে উঠতে পারছেন না। দুই বেলা বাস চলাচল ও নির্দিষ্ট স্টপেজে থামার কারণেও অনেক নারী এতে আগ্রহী হচ্ছেন না। বিশেষায়িত বাসে চলাচল নিয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন তারা। সামাজিকমাধ্যমে পিংক বাসের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।

ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী লায়লা ইয়ামিন (৪০) জানান, আগে তিনি পাবলিক বাসে যাতায়াত করতেন। পিংক বাস চালুর পর থেকে প্রতিদিন এই বাসেই কর্মস্থলে যাচ্ছেন। শুরুতে সময়সূচি নিয়ে সমস্যা হলেও এখন আর হচ্ছে না। মিরপুর-১২ থেকে আসা বাসটি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফার্মগেট দিয়ে যায়। ফলে তাকে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

গত বুধবার কারওয়ান বাজার এলাকায় এক নারীকে দৌড়ে পিংক বাসে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। সেখানে নির্ধারিত স্টপেজ না থাকায় তিনি শেষ পর্যন্ত সাধারণ বাসে ওঠেন। এ সময় বাসের যাত্রীরা জানান, রুটের বিভিন্ন জায়গায় স্টপেজ থাকলে আরও অনেকে পিংক বাসে যাতায়াত করতে পারতেন।

রেহানা পারভীন নামে এক যাত্রী বলেন, নারী চালকেরা বেশি সতর্কতার সঙ্গে বাস চালানোর কারণে কিছুটা ধীরগতি দেখা যায়।

শনির আখড়া থেকে মতিঝিল রুটের বাসচালক সুপ্রিয়া কুণ্ডু বলেন, নারীরা আগ্রহ নিয়েই পিংক বাসে উঠছেন। আগামীতে যাত্রী আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।

মতিঝিল ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন বাজার, তালতলা, মিরপুর, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মোহাম্মদপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা বাসগুলো সকালের ট্রিপ শেষ করে ডিপোতে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলে নির্ধারিত সময়ে আবার সেগুলো যাত্রী পরিবহনের জন্য বের হয়। যাত্রীদের গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে বাসগুলো আবার মতিঝিল ডিপোতে রাখা হয়।

যাত্রী বাড়লেও প্রকল্প নিয়ে ভিন্নমত

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস একটি অদূরদর্শী প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ বা কোনো জরিপ ছাড়াই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস কোনো কার্যকর সমাধান নয়। বাসের রঙ পরিবর্তন ও নতুন নাম দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। তার মতে, সব বাস নারী ও শিশুবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিআরটিসির ডিজিএম অপারেশন শুকদেব ঢালী বলেন, মহিলা বাস সার্ভিসের ক্ষেত্রে সেবার দিকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। নারী যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। মাত্র এক মাসেই যাত্রী বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সামনে যাত্রীসংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন। এ মুহূর্তে লাভ-লোকসানের হিসাবে না যাওয়াই ভালো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নারী চালক বেড়ে ২৬, আরও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ

প্রশিক্ষণ শেষে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০ জন নারী চালক গত বৃহস্পতিবার পিংক বাস সার্ভিসে যোগ দিয়েছেন। এতে নারী চালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। তৃতীয় ধাপের নারী চালকদের প্রশিক্ষণ চলতি মাসে শুরু হবে বলে জানিয়েছে বিআরটিসি। ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক বাস চালানোর জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।

বহরে যুক্ত হবে আধুনিক সুবিধার আরও ১০০ বাস

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পিংক বাসের বহরে আরও ১০০টি অত্যাধুনিক বাস যুক্ত করা হবে। বাসগুলো তুলনামূলক ছোট হবে। এতে ওয়াই-ফাই, সিসি ক্যামেরা, এসিসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা থাকবে।