মঙ্গলবার

৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২০ আশ্বিন, ১৪৩৩

২২ ব্যাংকের লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৩৬

শেয়ার

২২ ব্যাংকের লোকসান আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দেশের ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। তারল্যসংকট সামাল দিতে চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা জরুরি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে রবিবার (৪ অক্টোবর) কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সময় ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন কমিটির সদস্যরা। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে নিট ক্ষতি হয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে আয়ও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। সম্পদের ওপর উপার্জন হার ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং মূলধনের ওপর উপার্জন হার ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ।

লোকসানে থাকা ২২ ব্যাংক

লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক হলো জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক দুটি হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংক হিসেবে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর লোকসানের কারণ হিসেবে উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সম্পদমানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর উপার্জন ক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ঋণজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংকে নিট ক্ষতি হচ্ছে।

১২ ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট হিসেবে ১২টি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা বা ডিমান্ড লোন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এর পরিমাণ ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪২ কোটি ৭৯ লাখ, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি ২৫ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৫ লাখ, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি ১৬ লাখ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের আগস্ট শেষে নগদ ও সরকারি সিকিউরিটিজসহ ব্যাংক ব্যবস্থার মোট তরল সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আগস্ট শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ১ লাখ কোটি টাকা।

তবে ব্যাংক ব্যবস্থার এই তরল সম্পদের বণ্টন সুষম নয়। অধিকাংশ প্রচলিত ধারার ব্যাংকে পর্যাপ্ত তরল সম্পদ থাকলেও কিছু প্রচলিত ধারার ব্যাংক এবং অধিকাংশ ইসলামী ধারার ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি রয়েছে। তরল সম্পদের সিংহভাগ সরকারি সিকিউরিটিজ, অর্থাৎ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা রয়েছে।

খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা

চলতি বছরের ৩০ জুন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। ৩১ মার্চ খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

১০ শতাংশের বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার কমাতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ ভিত্তিতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৪০টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক।

ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর এমপি সাইফুল আলম। তিনি বলেন, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দলের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা কমানো প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬৩টি ব্যাংক রয়েছে।

সাইফুল আলম আরও বলেন, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করতে পারবে না।

সূত্র জানায়, বৈঠকে এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ অর্থঋণ আদালত ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। প্রয়োজনে পৃথক বেঞ্চ গঠনের কথাও বলেন তিনি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, খেলাপি ঋণে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ঋণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণের জন্য তিনি অর্থমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশ নেন কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান কিরন, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)।