রবিবার

৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯ আশ্বিন, ১৪৩৩

নাবিল গ্রুপের ঋণে ইউসিবির ঝুঁকি বাড়ানোর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:০০

শেয়ার

নাবিল গ্রুপের ঋণে ইউসিবির ঝুঁকি বাড়ানোর অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর ইউসিবির আর্থিক সংকটের মধ্যেই নাবিল গ্রুপকে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি খাতের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক বা ইউসিবি নাবিল গ্রুপের বিদ্যমান ৮৪৫ কোটি টাকার ঋণসীমা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

নথি অনুযায়ী, নতুন করে ১ হাজার ২০ কোটি টাকার ঋণসুবিধা যুক্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রিমিয়ার ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের পুরোনো ৫২০ কোটি টাকার দায় পরিশোধেও ইউসিবির অর্থ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকার সমন্বিত ঋণসীমা ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।

নাবিল গ্রুপের নামে-বেনামে ইসলামী ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউসিবির কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর সময়ে এই ধরনের অর্থায়ন ব্যাংকটির ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

অর্থায়নের পরিমাণ ও সুবিধার ধরন

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউসিবির সূত্রের নথি অনুযায়ী, নাবিল গ্রুপকে আগে ৮৪৫ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছিল। এবার তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবের বড় অংশ রিভলভিং ক্রেডিট লিমিট ৬৮৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রিভলভিং এলসি সীমা ৫২৫ কোটি থেকে ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা, এলটিআর সীমা ২৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকা এবং রিভলভিং টাইম লোনের সীমা ১৮০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

কাস্টমস ডিউটি, এআইটি ও ভ্যাট পরিশোধের জন্য নতুন করে রিভলভিং টাইম লোন-২ হিসেবে ১৫০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টির সীমা ২০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৪০ কোটি টাকা করার কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৬০ কোটি টাকার ওভারড্রাফট বা এসওডি সুবিধা চালু রাখা এবং স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল কেনার জন্য আরও ১৬০ কোটি টাকার নির্দিষ্ট মেয়াদি ঋণ বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থাৎ আমদানি, আমদানি-পরবর্তী দায়, সরকারি শুল্ক-কর পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং ব্যাংক গ্যারান্টিসহ কার্যকরী মূলধনের বিভিন্ন খাতে নাবিল গ্রুপকে ঋণসুবিধা দেওয়ার কাঠামো করা হয়েছে।

পাঁচ প্রতিষ্ঠানের জন্য সমন্বিত ঋণসীমা

নথি অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকার সমন্বিত ঋণসীমা নাবিল গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অথবা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নাবিল নাবা ফুডস লিমিটেড, নাবিল ফিড মিলস লিমিটেড, নাবিল অটো ফ্লাওয়ার মিল, শিমুল এন্টারপ্রাইজ ও নাবিল এডিবল অয়েল লিমিটেড।

গ্রুপভিত্তিক অর্থায়ন ব্যাংকিং নিয়মে বেআইনি নয়। তবে প্রদত্ত তথ্যে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও আর্থিক বিবরণী বিবেচনা না করে একত্রে বড় ঋণসীমা দিলে প্রকৃত ঝুঁকি কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর রয়েছে, তা স্পষ্ট নাও হতে পারে।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের দায় পরিশোধে ইউসিবির অর্থ

নথির অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো নাবিল গ্রুপকে ৫২০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন। এই অর্থ দিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকে থাকা গ্রুপটির পুরোনো দায় পরিশোধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৫২০ কোটি টাকার মধ্যে ২২৩ কোটি টাকা এককালীন ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ২৯৭ কোটি টাকা এককালীন মেয়াদি ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে। ২৯৭ কোটি টাকার ঋণটি সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের জন্য ১৩ শতাংশ সুদে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, এই অর্থ নাবিল গ্রুপের নতুন কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিবর্তে প্রিমিয়ার ব্যাংকের দায় পরিশোধে যাবে। ফলে একটি ব্যাংকের দায় অন্য ব্যাংকের অর্থায়নের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জামানত সম্পন্ন করতে এক বছর সময়

বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাওনা সুরক্ষিত রাখতে জামানত বা স্থাবর সম্পদের ওপর আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নাবিল গ্রুপের ক্ষেত্রে ব্যাংকের অনুকূলে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বন্ধকী দলিল ও চার্জ সম্পন্ন করতে ৩৬০ দিন বা এক বছর সময় দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে ইউসিবির ক্রেডিট কমিটি।

প্রদত্ত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, অতীতের বিভিন্ন অনুসন্ধানে নাবিল গ্রুপের বিরুদ্ধে ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া এবং অপ্রতুল জামানত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে জামানত নিশ্চিত করার আগেই বড় ঋণসীমা উন্মুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ইউসিবির খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি

২০২৫ সালের শেষে ইউসিবির নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ৬১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ ৯ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা।

এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংক ২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা সংরক্ষণ করতে পেরেছিল। এতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। অন্যান্য সম্পদ সমন্বয়ের পর মোট প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।

একই সময়ে ইউসিবির মূলধন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত বা সিআরএআর নেমে আসে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত সীমার নিচে।

ইউসিবি রাইটস শেয়ার ইস্যু ও অন্যান্য উপায়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে নতুন আমানত বেড়েছে, ঋণ-আমানত অনুপাত কিছুটা কমেছে এবং খেলাপি ঋণ আদায়েও অগ্রগতি হয়েছে।

তবে পূর্ণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হলে ইউসিবির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সময়ের অনিয়মের অভিযোগ

ইউসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের বিভিন্ন নথিতে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের ব্যাংকটিতে প্রভাব এবং অনিয়মের অভিযোগের তথ্য রয়েছে।

২০২৪ সালে ইউসিবির বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জহীর দুদকে দেওয়া এক অভিযোগে দাবি করেন, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবার ব্যাংকটিতে ব্যাপক দুর্নীতি করেছেন। ওই সময়ে সাবেক মন্ত্রীর স্ত্রী রুকমিলা জামান ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী নির্বাহী কমিটির দায়িত্বে ছিলেন।

ওই অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী ও তার সহযোগীদের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের কথা বলা হয়।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক সাবেক মন্ত্রী, তার স্ত্রী ও তৎকালীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ২৫ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ২৫০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে পৃথক মামলা করা হয়।

নাবিল গ্রুপের ঋণ ও মামলা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের নিজস্ব নামে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বেনামি ঋণ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তথ্য থাকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে নাবিল গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠানের নামে ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ঋণের তথ্য ছিল। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেনামি ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ইসলামী ব্যাংক থেকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

নাবিল গ্রুপের বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন ও অপরিচিত ব্যক্তিদের নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় দুদক একাধিক মামলা করেছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীনুল ইসলামসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে নাবা অ্যাগ্রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬৭০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও ৩৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও নাবিল গ্রুপের এমডির বিরুদ্ধে মামলা হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জামান সিন্ডিকেট নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলামী ব্যাংকের পাবনা শাখা থেকে ১ হাজার ৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরও একটি মামলা করা হয়।

এ ছাড়া এস আলম গ্রুপের প্রধান সাইফুল আলমের সঙ্গে নাবিল গ্রুপের এমডি আমীনুল ইসলামের সরাসরি ব্যবসায়িক ও আর্থিক যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়ার কথা তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দায়ের হওয়া একটি ঋণ জালিয়াতি মামলায় সাইফুল আলম ও আমীনুল ইসলামকে যৌথভাবে আসামি করা হয়েছে।

ইউসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও বক্তব্য

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে ইউসিবি পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহীর। তার বাবা প্রয়াত হুমায়ুন জহীর ছিলেন ইউসিবির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম চেয়ারম্যান।

১৯৯৩ সালের ৮ এপ্রিল ইউসিবির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডির বাসভবনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে হুমায়ুন জহীর নিহত হন।

নাবিল গ্রুপকে এ ধরনের বড় ঋণসুবিধা দেওয়ার কারণ জানতে ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহীর ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তাদের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকটির চিফ কমিউনিকেশন অফিসার জীশান কিংশুক হক চেয়ারম্যান অথবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের যেকোনো একজনের বক্তব্য দেওয়ার জন্য দুই দফা সময় নিলেও পরে কোনো বক্তব্য দেননি।