চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও এর আওতাধীন ওভারফ্লো ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য বিদেশি বা আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য খসড়া কনসেশন চুক্তির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) এ চুক্তি করবে।
সরকার মনে করছে, আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে টার্মিনালটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যেই স্বাক্ষরিতব্য কনসেশন চুক্তির খসড়া কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনকর্মীরা বিদেশিদের কাছে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছেন।
চুক্তির সিদ্ধান্তে বন্দর রক্ষা কমিটির ক্ষোভ
ওভারফ্লো ইয়ার্ডসহ এনসিটি ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু।
বৃহস্পতিবার এক যুক্ত বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভার মূল অ্যাজেন্ডায় বিষয়টি না থাকলেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি বিষয় বিবিধ অ্যাজেন্ডার মাধ্যমে উত্থাপন করে আলোচনা করা হয়েছে।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনস্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থাকা প্রয়োজন। মূল অ্যাজেন্ডার বাইরে বিবিধ অ্যাজেন্ডার মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, কনসেশন চুক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা কাঠামো। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এর মাধ্যমে পরিচালনা, রাজস্ব, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে দীর্ঘ সময়ের জন্য বেসরকারি বা বিদেশি অপারেটরের প্রভাব তৈরি হতে পারে।
এ কারণে চুক্তির প্রতিটি ধারা, আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ভাগাভাগি, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ঝুঁকি বণ্টন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ ও যথাযথভাবে যাচাইয়ের দাবি জানান তাঁরা।
রাষ্ট্রের নিজস্ব বিনিয়োগে নির্মিত একটি প্রতিষ্ঠিত টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনের আওতায় বিদেশিদের দেওয়ার আগে রাষ্ট্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এর সক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা যাচাই করেছে কি না, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়।
নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, অটোমেশন, প্রশিক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার সংস্কারের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও জনবলকে আরও সক্ষম করে তোলা সম্ভব। কোনো চুক্তির ফলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়, রাজস্ব ক্ষতি কিংবা ভবিষ্যতে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে তা তাড়াহুড়ো করে চূড়ান্ত করা উচিত নয়।
প্রয়োজনে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে জাতীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও সংসদীয় পর্যালোচনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তাঁরা।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া ও আর্থিক কাঠামো জনসমক্ষে প্রকাশ, স্বাধীন অর্থনৈতিক ও কারিগরি মূল্যায়ন, শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার দাবি জানান।
একই সঙ্গে এনসিটি পরিচালনায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থাপনা কাঠামো বিবেচনার আহ্বান জানান তাঁরা। জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না করা এবং এনসিটি কনসেশন চুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ।
নিরাপত্তা মজুতের জন্য ১ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন
অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির একই বৈঠকে দেশে নিরাপত্তা মজুত গড়ে তুলতে ১ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির নীতিগত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
সার ও এমআরটি অবকাঠামো নির্মাণে বড় ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন
একই দিন একই স্থানে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) ৩১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ২ লাখ ৬০ হাজার টন ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার কিনতে ২ হাজার ১০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকার ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ ও লাইন-৫-এর বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ কেনার ট্যারিফ কমল, সাশ্রয় হবে ৪৩১ কোটি টাকা
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানির ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ কেনার ট্যারিফ প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৫ টাকা ৮১ পয়সা থেকে কমিয়ে ৫ টাকা ৭৭ পয়সা করা হয়েছে।
এতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বছরে প্রায় ৩০ কোটি ৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে। চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ হবে ৪৩১ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
সংশোধিত ট্যারিফ ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। এ-সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনার জন্য ৩ কোটি ৮৭ লাখ চক্র খাবার বড়ি কেনা হবে
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের জন্য তৃতীয় প্রজন্মের ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার চক্র খাবার বড়ি কিনতে ১৯৩ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুটি প্যাকেজে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার চক্র করে মোট ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার চক্র খাবার বড়ি কেনা হবে। সমাপ্ত চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচির অত্যাবশ্যকীয় পরিবার পরিকল্পনা, মা, শিশু ও প্রজননস্বাস্থ্য সেবার অসমাপ্ত কার্যাবলি বাস্তবায়ন প্রকল্পের আওতায় সরকারি অর্থে এসব বড়ি কেনা হবে।
প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
আরও পড়ুন:







