সোমবার

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

শিল্পায়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১৯

শেয়ার

শিল্পায়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে বিবেচনা করা হলেও শিল্প খাতে এর অবদান খুবই কম। অর্থনীতির আকার বাড়লেও পুঁজিবাজারের গভীরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। গত প্রায় আড়াই বছরে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক ঋণ তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্য ব্যাংকের ওপরই নির্ভর করছেন। এতে শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা কমছে। শিল্প খাতে মোট অর্থায়নের সামান্য অংশ পুঁজিবাজার থেকে আসায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঝুঁকিও ব্যাংক খাতের ওপর বেশি পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্পায়নে ব্যাংক খাত থেকে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৩০২ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের মাত্র ০.৩১ শতাংশ।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়ন হয় ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। পুঁজিবাজার থেকে আসে ৬৭৯ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের ০.৭৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন হয় ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা এবং পুঁজিবাজার থেকে আসে ৬৪১ কোটি টাকা, যা ০.৬৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থায়ন হয় ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। পুঁজিবাজার থেকে আসে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের ০.৯৪ শতাংশ।

আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, গত প্রায় আড়াই বছরে বাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হন না।

তিনি বলেন, দেশে একটি আইপিও অনুমোদন হয়ে বাজারে আসতে সর্বনিম্ন ১৫ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ ব্যাংকে আবেদন করলে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ঋণ পাওয়া সম্ভব, ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ তিন মাস সময় লাগে। ফলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

তবে নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএপিএলসি সভাপতি বলেন, শেয়ারবাজারের নতুন কমিশন পরিস্থিতি পরিবর্তনে কাজ করছে। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোচ্ছে। পাশাপাশি সিকিউরিটিজ নীতিমালায় কিছু বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) সুযোগ পুনরায় চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে অর্থায়নের অনুপাত নির্ধারণের প্রস্তাব

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুমিত পোদ্দার আমার দেশকে বলেন, অর্থায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে কত টাকার বেশি অর্থায়ন হলে ব্যাংকের বাইরে পুঁজিবাজারে আসতে হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যত সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়, সেটি বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। তাই পুঁজিবাজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ব্যবসায়িক প্রকল্প বা শিল্প সম্প্রসারণে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণ করা যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি মোট অর্থায়নের ৬০ শতাংশ ব্যাংক এবং ৪০ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে নেওয়ার নিয়ম করার প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, বর্তমান তারল্য সংকটে কেবল ব্যাংকের পক্ষে উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই বড় প্রকল্প বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অঙ্কের পর পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আইনিভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের আকারও কম

বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের অর্থায়নে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে এসব দেশে বড় প্রকল্পের মূলধন সংগ্রহ করা হয়।

ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের মূলধনের অনুপাত ৮০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশে এই অনুপাত ১০ শতাংশেরও নিচে। দীর্ঘমেয়াদি বড় ঋণের ওপর ব্যাংক খাতের নির্ভরতা বাড়ায় খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটও জটিল হচ্ছে।

ভালো শেয়ারের ঘাটতি, দুর্বল বন্ড বাজার

দেশের পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের ঘাটতি এবং একমুখী ইকুইটি নির্ভরতার কথাও উঠে এসেছে। নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বন্ড মার্কেট ও মিউচুয়াল ফান্ড খাত শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে বাজারে ভালো ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারের ঘাটতি রয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে বাজারে আসা অনেক আইপিওর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি পরবর্তী সময়ে লোকসানি বা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পরিণত হয়েছে। ভালো বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর নীতিগত কর-প্রণোদনা না থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম আমার দেশকে বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ইতোমধ্যে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোও দূর করার কাজ চলছে।

কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টিও কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বন্ড বাজার আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি করপোরেট বন্ডের প্রবাহ বাড়াতে কমিশন বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।