বুধবার

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ নিয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:০৪

শেয়ার

ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ নিয়োগ
ছবি সংগৃহীত

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে। এসব নিয়োগের বড় অংশ হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা থেকে। শুধু পটিয়া উপজেলারই নিয়োগ পেয়েছেন ৫ হাজার ১৪৮ জন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে অনিয়মের অভিযোগে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটি পরিদর্শন শেষে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিমালাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

সিভি জমা দিতে রাখা হয়েছিল আলাদা বাক্স

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে গ্রুপের অফিসে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার জন্য আলাদা বাক্স রাখা হয়েছিল। এসব বাক্সে বিভিন্ন পদ ও এলাকার নাম উল্লেখ করা থাকত।

ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে ছিল পটিয়া জেনারেল, পটিয়া ক্যাশ, পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী, সনাতন জেনারেল, মহিলা ক্যাশ, পিয়ন-ডিপ্লোমা, পুরুষ জেনারেল ও পুরুষ ক্যাশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল দৈবচয়নের ভিত্তিতে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেয়। তাঁরা জানান, এস আলমের পটিয়ার বাড়ি ও আসাদগঞ্জের অফিসে রাখা বাক্সে তাঁরা সিভি জমা দিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং পরে যোগদানপত্র দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজনের কোনো মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি।

ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালাও মানা হয়নি

ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান রয়েছে। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা। লিখিত পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বরকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করার নিয়ম রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭টি পদে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৭৮৯ জন, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে ২ হাজার ১৬০ জন, মেসেঞ্জার কাম গার্ড পদে ১ হাজার ৫৪৪ জন, রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিমের (আরডিএস) স্টাফ হিসেবে ৯১৫ জন এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে ৫০১ জন নিয়োগ পান।

উচ্চপদেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), আটজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), দুজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের একজন প্রিন্সিপালকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচজন এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টের (ইভিপি) মধ্যে চারজনকেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ডিএমডি হতে অন্তত ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তী পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ শর্ত পূরণ না করেই এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে আট বছরের এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় ডিএমডি করা হয়।

চট্টগ্রাম জেলা থেকে নিয়োগ ৮ হাজার ৯৯ জন

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলারই ৮ হাজার ৯৯ জন। তাঁদের মধ্যে পটিয়া উপজেলার ৫ হাজার ১৪৮ জন।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কক্সবাজারের ৩৯৮ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়া কুমিল্লার ১১৪, ময়মনসিংহের ৯৯, বগুড়ার ৯৭ এবং ঢাকা জেলার ৯৬ জন নিয়োগ পান। রাজশাহীর ৮৩, যশোরের ৭৮, গাইবান্ধার ৭৫ এবং রংপুরের ৬৬ জনও নিয়োগ পেয়েছেন। বাকি ৫৪ জেলা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় ১ হাজার ৬২৭ জনকে।

বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৭ সালে ৩৬৭ জন, ২০১৮ সালে ১ হাজার ১১৮ জন, ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৬৭ জন, ২০২০ সালে ২ হাজার ১১০ জন, ২০২১ সালে ৮৬৫ জন, ২০২২ সালে ২ হাজার ১১৯ জন, ২০২৩ সালে ৩৯৭ জন এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৩৯২ জন নিয়োগ পান।

প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও অনিয়মের তথ্য

প্রতিবেদনে প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ১৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ১২ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পান। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৪০ জনের সিভি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ৭৬৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পান মাত্র ৩৬ জন। পরে নম্বরের শর্ত শিথিল করে ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া প্রার্থীদেরসহ ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়।

শেষ পর্যন্ত ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংক এবং ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের সবাই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা ছিলেন।

পরে ওই ব্যাচের ১৮৪ জন যোগদান করেন। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে ৩১ জন চাকরিতে আছেন, ২১ জন পদত্যাগ করেছেন এবং ১৩১ জন চাকরি হারিয়েছেন। একজন মারা গেছেন।

তবে ২০১৭ সালের ১৪৪ জন এবং ২০২৪ সালের ২০০ জন প্রবেশনারি অফিসারের নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যায়ন পরীক্ষার পর ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন এবং চারটি বহির্নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষায় ওই সময়ের নিয়োগে বিভিন্ন অনিয়ম চিহ্নিত হয়। এরপর এসব নিয়োগের যোগ্যতা যাচাইয়ে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ।

শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ২০২৫ ওই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে বহাল আছেন। ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। পরে বিভিন্ন কারণে আরও ২৮৭ জনকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়।

পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে। এছাড়া ১৫৫ জন কক্সবাজারের এবং অন্য জেলারও কর্মী রয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই সময়ের নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আরও কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। বিভিন্ন অভিযোগে ১২১ জন, চুক্তির মেয়াদ শেষে নবায়ন না করায় ১ হাজার ১৯০ জন এবং অন্যান্য কারণে ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, তাঁদের প্রথমে ওএসডি করা হয় এবং পরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।