মঙ্গলবার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

আবারও দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা, বাড়ছে পরিবহন ভাড়াও

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:১০

শেয়ার

আবারও দ্রব্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কা, বাড়ছে পরিবহন ভাড়াও
ছবি সংগৃহীত

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সোমবার রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে এখনো অধিকাংশ পণ্যের দামে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দেখা যায়নি। তবে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে সামনে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।

এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার একদিনের মধ্যেই রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পণ্য পরিবহন ও রাইডশেয়ারিংয়েও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধিতে নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষ অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে পড়েছেন।

রাজধানীর চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে চলাচলকারী বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন। দূরপাল্লার রুটেও এর প্রভাব পড়েছে। সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামগামী লোকাল বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

যাত্রীরা বলছেন, গণপরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় রাইডশেয়ারিং সেবাতেও চালকরা বাড়তি ভাড়া চাইছেন। পণ্য পরিবহনেও ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন ট্রাক ও পিকআপ চালকরা। এতে মাস শেষে পরিবহন ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নিয়মিত যাত্রীরা।

জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম কার্যকর হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এতে জ্বালানি নিতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে স্টেশনের কর্মীদের মারামারির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্যও পাওয়া গেছে।

মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজভাড়া বাড়তে থাকায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে। তেলের দাম ও জাহাজভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। উপায়হীন না হলে সরকার এমন অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে চাইত না।

প্রতিমন্ত্রী জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, তা তিনি উপলব্ধি করেন উল্লেখ করে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেল ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় মূল্য ২০৫ টাকা। মূল্য সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। নতুন দাম নির্ধারণের পরও প্রতি লিটারে ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে। আগে এ লোকসানের পরিমাণ ছিল ৯০ টাকা।

তিনি বলেন, দাম সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলেই বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতো। সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াত ৫০ হাজার কোটি টাকা।

জ্বালানি তেলে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার অসচ্ছল পরিবারগুলোকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনতে চায়। সামনে কোনো বিকল্প না থাকায় তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। জনগণ বিষয়টি উপলব্ধি করবেন বলে আশা করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এ কারণে তেলের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাত সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটি দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং সিটি সার্ভিস বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।

তবে যাত্রীস্বার্থ বিবেচনায় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সোমবার বিআরটিএর বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এসব সুপারিশ করা হয়। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের পাশাপাশি বাস পরিচালনার অন্যান্য ব্যয়ও বৈঠকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিআরটিএর সুপারিশ সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। মঙ্গলবারের মধ্যে ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত নতুন ভাড়া কার্যকর হবে না।

প্রস্তাব অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি বর্তমান ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ভাড়া বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সিটি বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন এলাকায় মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে।