দেশের ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণ, তারল্যসংকট ও অনাদায়ী অর্থ উদ্ধারে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। খাতা-কলমে যে ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি নাজুক বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে রেকর্ড ছাড়িয়ে মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের মূল কাজ হলো আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে শিল্প, ব্যবসা ও ব্যক্তিশ্রেণিতে ঋণ দেওয়া এবং সেই ঋণের সুদ ও মাশুল থেকে আয় করা। তবে খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্যসংকট এবং অনাদায়ী অর্থ উদ্ধারে সমস্যার কারণে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণের ঝুঁকি কমিয়ে সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। নিশ্চিত রিটার্নের আশায় সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখাকে অনেক ব্যাংক তুলনামূলক নিরাপদ পথ হিসেবে নিচ্ছে।
সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতের এই গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে আসে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো সাময়িকভাবে কিছু আয় দেখাতে পারলেও এতে তাদের মূল আয় নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম কমে যাচ্ছে।
ব্যাংকের কোর ব্যাংকিংয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের মাধ্যমে আয় করা। ব্যাংকগুলো যদি ঋণ বিতরণ কমিয়ে সরকারি ট্রেজারি বন্ডনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ঋণের অর্থ অর্থনীতিতে বারবার ব্যবহার হওয়া। ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ঋণ দেয়। সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ ফেরত এলে তা আবার নতুন ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় এই স্বাভাবিক চক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সালে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা প্রায় ২০ গুণ বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আগে ব্যাংক খাতে খাতা-কলমে খেলাপি ঋণ ৮ থেকে ১০ শতাংশ দেখানো হতো। দুর্দশাগ্রস্ত ঋণসহ তা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হতো। তবে নীতিগত সহায়তায় থাকা ঋণ, পুনঃতফসিলকৃত সুবিধা এবং প্রকৃত ঝুঁকির তথ্য বিবেচনায় নেওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ অনুমোদন ও আদায়ে সুশাসন, জবাবদিহি, নৈতিকতা এবং যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন ড. মাহবুব উল্লাহ। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা শক্তিশালী করতে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অলস তহবিলের বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে
২০২৬ সালের জুনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত বা অলস তহবিল ছিল। তবে এই অর্থের পুরোটা নগদ ছিল না। এর মধ্যে ৮১ দশমিক ০৪ শতাংশ অনুমোদিত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা ছিল এবং ৩২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছিল প্রকৃত নগদে।
সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদে কিছু মুনাফা এনে দিলেও এর ফলে ব্যাংকের মূল আয়, অর্থাৎ টাকা নেওয়া ও টাকা দেওয়ার মধ্যকার নিট ইন্টারেস্ট মার্জিন কমছে। এতে ব্যাংকগুলো সরকারের ঋণের জোগানদাতা হিসেবে বেশি ভূমিকা রাখছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ধীর হয়ে পড়ছে।
সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট আর কয়েকটি নির্দিষ্ট দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোয় পদ্ধতিগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। একটি দুর্বল ব্যাংকের তারল্যসংকট অন্য ব্যাংকের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
এ অবস্থায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি নগদ অর্থ সরবরাহ করে ব্যাংক খাত সুস্থ করার চিন্তাকে তারা অবাস্তব বলে মনে করছেন। একইভাবে পরিচালন ব্যয় ও অদক্ষতা না কমিয়ে কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করেও সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না বলে তাদের মত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব মূল ব্যবসায় ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপমুক্ত থেকে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান নির্ধারণ করতে হবে। লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব বের করার পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে ঋণ মূল্যায়ন এবং আদায় প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সম্প্রতি বলেন, শুধু সুদের হার বা সরকারি সিকিউরিটিজে আমানত রেখে ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে ব্যাংকগুলো মুনাফা করলেও ব্যাংকের মূল কাজ ঋণ বিতরণ থেকে আয় মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে।
তার মতে, প্রকৃত সুদ আয় বা নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম কমেছে, যা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য আশঙ্কাজনক।
আরও পড়ুন:


.jpg)




