বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে ৪১টি ব্যাংক। বিভিন্ন ব্যাংকে আবেদনও জমা পড়ছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে কারখানা চালু করতে বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুযোগও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকাও বিতরণ হয়নি।
অর্থের সংকটের চেয়ে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো খেলাপি ঋণ, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, কারখানার অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বাজার পরিস্থিতি এবং ব্যাংকের ঝুঁকি নেওয়ার অনীহার কারণে আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া। কোনো কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তহীনতাও এতে যুক্ত হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে নীতিগত সুবিধা
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খেলাপি ঋণ কমিয়ে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একদিকে ঋণ আদায়ে কঠোরতা, অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। একই সঙ্গে গ্রাহকেরা যেন তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন এবং ব্যাংকগুলোও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি বলেন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে এমন গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত সময় দিয়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। আর যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছেন না, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে।
এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের বিশেষ সুযোগ
গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নে নতুন সুযোগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আওতায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন গ্রাহকেরা দুই বছর ঋণ পরিশোধে বিরতিসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের সুযোগ পাবেন।
এই সুবিধা নিতে আগ্রহীদের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তার আওতায় সুবিধা নেওয়া গ্রাহকেরাও নির্দিষ্ট শর্তে নতুন করে আবেদন করতে পারবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করাও এ ধরনের নীতিগত সহায়তার অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা বাস্তব সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে এই সুবিধা রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালেও খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তখন ন্যূনতম ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছিল। আগে তিন বা তার বেশি বার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়ে থাকলে অতিরিক্ত ১ শতাংশ নগদ জমার শর্তও ছিল। সেই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবার আরও দীর্ঘ সময়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
২০ হাজার কোটি টাকা থাকলেও অর্থ ছাড় হচ্ছে না
বন্ধ কারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড় হচ্ছে না। কারণ নীতিগত সুযোগ পাওয়া আর অর্থায়ন পাওয়ার প্রক্রিয়া এক নয়।
কোনো বন্ধ কারখানার আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংককে দেখতে হচ্ছে পুরোনো ঋণ কীভাবে নিয়মিত হবে, উদ্যোক্তার আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা কতটা, কারখানার অবকাঠামো সচল করার মতো অবস্থায় আছে কি না এবং নতুন অর্থায়ন করা হলে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন এক হাজারের বেশি পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ খেলাপি। ফলে নতুন অর্থ দিয়ে কারখানা চালুর সঙ্গে পুরোনো ঋণ নিয়মিত করার বিষয়টিও সামনে আসছে। এ কারণে অনেক আবেদন আটকে যাচ্ছে।
কার্যকরী মূলধনের পাশাপাশি প্রয়োজন অবকাঠামো ও জ্বালানি
ব্যাংকারদের বক্তব্যে সমস্যাটির আরেকটি দিক উঠে এসেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, শুধু কার্যকরী মূলধন দিলেই বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু হবে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের মূলধনি বিনিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার ও জ্বালানি সুবিধার প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, একটি শিল্পগোষ্ঠীর একটি কোম্পানি চালু করা তুলনামূলক সহজ হলেও পুরো একটি গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে সেটি পুনরুজ্জীবিত করা অনেক কঠিন।
কারখানা চালুর আগে গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে কি না এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারে চাহিদা রয়েছে কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে নতুন অর্থায়নও শেষ পর্যন্ত নতুন খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে।
কোভিডের সময় দেওয়া প্রণোদনা ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আদায় হয়নি। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও ব্যাংকগুলো নতুন করে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক।
১৯৩ আবেদনের মধ্যে অনুমোদন মাত্র ৫টির
ব্যাংকগুলো আবেদন নিচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, তাদের ব্যাংকে এখন পর্যন্ত ১৯৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ মাত্র পাঁচটি আবেদন অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে।
আবেদন যাচাই শেষে পরিচালনা পর্ষদকেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কোন প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেওয়া হবে, কোনটিকে দেওয়া হবে না এবং কী শর্তে অর্থায়ন করা হবে। ফলে যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই বড় সময় চলে যাচ্ছে।
পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তেও নির্ভর করছে অর্থ ছাড়
কেন্দ্রীয় ব্যাংক একের পর এক নীতিগত উদ্যোগ নিলেও কিছু ব্যাংক তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করছে না, এমন অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগ্রহী হলেও পর্ষদের অন্য সদস্যদের কেউ কেউ বিষয়টি দ্রুত সমাধানে আন্তরিক নন। ফলে নিয়মিতভাবে বোর্ড সভা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা বড় ঋণ পুনঃতফসিল বা নতুন অর্থায়নের প্রস্তাব তৈরি করতে পারলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে বোর্ডের দীর্ঘসূত্রতা থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তাও বাস্তবে ধীর হয়ে যায়।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিকে আলাদা বিবেচনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগে সব খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে একইভাবে দেখলে চলবে না। কোনো উদ্যোক্তা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, বাজার পরিস্থিতির অবনতি, কাঁচামালের সংকট বা অন্য বাস্তব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খেলাপি হয়ে থাকলে তার জন্য আলাদা বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, বন্ধ কারখানার প্রকৃত ব্যবসা ও সক্ষম উদ্যোক্তা থাকলে ব্যাংকগুলোর আরও সহযোগিতামূলক ভূমিকা নেওয়া উচিত। যথাযথ যাচাই করে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করা গেলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়বে, জিডিপিতে অবদান রাখবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
সঠিক প্রতিষ্ঠান বাছাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
২০ হাজার কোটি টাকার এই কর্মসূচিতে এখন বড় প্রশ্ন হলো সঠিক প্রতিষ্ঠানকে সঠিক শর্তে অর্থ দেওয়া। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সুযোগ দিলে ব্যাংক খাতে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত কঠোর শর্তের কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারাও অর্থ না পেলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
কোন কারখানা কেন বন্ধ হয়েছে, উদ্যোক্তার নিজের দায় কতটা, কারখানা চালু করতে কত অর্থ প্রয়োজন, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, বাজারে পণ্যের চাহিদা রয়েছে কি না এবং নতুন অর্থায়নের পর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা—এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেই কর্মসংস্থান হবে না। বন্ধ কারখানাকে বাস্তবে উৎপাদনে ফিরতে হবে। পুরোনো ঋণের সমাধান, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ, বাজার এবং ব্যাংকের সিদ্ধান্ত—এই বিষয়গুলোর সমন্বয় না হলে তহবিলের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত গতি পাবে না।
আরও পড়ুন:







