ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে সংকটে পড়া ব্যাংকের পুরোনো মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর ফেরার যে বিশেষ আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা বাতিল হয়েছে। ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে রেজল্যুশন বা একীভূতকরণের আওতায় যাওয়া ব্যাংকের সাবেক পরিচালক, মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর বিশেষ শর্ত পূরণ করে আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকল না।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ থেকে প্রকাশিত অতিরিক্ত সরকারি গেজেটে ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রকাশ করা হয়। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর এটি আইনে পরিণত হয়েছে এবং গেজেট প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে।
আইনটিতে মাত্র একটি ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। এতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুরোনো মালিকানা ফিরে পাওয়ার বিশেষ আইনি কাঠামোটিও আর কার্যকর থাকল না।
১৮(ক) ধারায় পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ ছিল
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এ ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছিল সংকটে পড়া ব্যাংক পুনর্গঠনে বাজারভিত্তিক একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির জন্য। কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার পর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত অর্থের সক্ষমতা দেখাতে পারলে নির্দিষ্ট শর্তে ব্যাংকের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আমানতকারীসহ পাওনাদারদের স্বার্থ রক্ষা করে ব্যাংকটি পুনর্গঠনের সুযোগ রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
তবে ধারাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে পুরোনো মালিকদের ঘিরে। আইনে এমন সুযোগ রাখা হয়েছিল, যাতে রেজল্যুশনের আওতায় থাকা ব্যাংকের সাবেক পরিচালক বা মালিকরা সরকারের বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে মালিকানায় ফেরার সুযোগ পেতে পারেন। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধের বিধান ছিল।
এ কারণে প্রশ্ন ওঠে, যে মালিকানা বা ব্যবস্থাপনার সময়ে একটি ব্যাংক সংকটে পড়েছে, সেই একই মালিক বা গোষ্ঠী অর্থের ব্যবস্থা করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরলে ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে।
এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে সামনে আসে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়ায়।
এস আলম গ্রুপকে ঘিরেই ছিল মূল উদ্বেগ
একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
এসব ব্যাংকের আর্থিক সংকট, ঋণ অনিয়ম, সুশাসনের দুর্বলতা এবং মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির অবনতি হলে এগুলো একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই প্রেক্ষাপটে ১৮(ক) ধারা কার্যকর থাকায় রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পুরোনো নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী আবার ব্যাংকের মালিকানায় ফিরতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে। আইনের ভাষায় সুযোগটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য ছিল না। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এস আলম গ্রুপের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে।
গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সেই বিশেষ আইনি পথ এখন বন্ধ হলো।
পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট ও আমানতকারীদের আস্থার সংকটের মধ্যে নতুন করে পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই অবস্থায় পুরোনো মালিকরা আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরলে সংস্কার প্রক্রিয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য থাকবে, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন।
নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৮(ক) ধারা বাতিলের কারণ
জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১৮(ক) ধারায় নির্ধারিত কঠোর নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করে কোনো শেয়ারহোল্ডার, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসেনি। ফলে ধারাটির মূল উদ্দেশ্য বাস্তবে অর্জিত হয়নি।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটে পড়া তফসিলি ব্যাংক পুনর্গঠনে বাজারভিত্তিক একটি বিকল্প কাঠামো দেওয়ার জন্য ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট মোকাবিলা, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং ব্যাংক অবসায়ন না করে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমানো।
কিন্তু আইন কার্যকর হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই ধারার সব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এ কারণে সরকার ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
শুধু মালিকানা পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন ব্যাংক পুনর্গঠন
ব্যাংক খাতের সংকটের সঙ্গে খেলাপি ঋণ, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, পরিচালনা পর্ষদের ওপর প্রভাব, একক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির নানা ঘাটতি জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। ব্যাংক আইনে এ ধরনের ধারা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না এবং এর ফলে ব্যাংক খাতে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
তাঁর মতে, ধারা বাতিলের ফলে ব্যাংক খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর যে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে শুধু এ ধারা বাতিল যথেষ্ট নয়। ব্যাংক পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করতে সরকারের আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা, সুশাসন ও ব্যবস্থাপনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। একই সঙ্গে আমানতকারী ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এস আলমের ফেরার বিশেষ আইনি সুযোগ আর নেই
১৮(ক) ধারা বাতিলের ফলে রেজল্যুশনের আওতায় থাকা ব্যাংকের মালিকানা বিশেষ পদ্ধতিতে পুনরুদ্ধারের সুযোগ আর নেই। ফলে এস আলম গ্রুপসহ সংশ্লিষ্ট পুরোনো নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর জন্য ওই আইনি পথে ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ বন্ধ হলো।
তবে এর সঙ্গে চলমান তদন্ত, মামলা, সম্পদ জব্দ বা অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো পৃথক আইনি প্রক্রিয়া। ১৮(ক) ধারা বাতিলের প্রভাব মূলত ব্যাংকের মালিকানা পুনরুদ্ধারের বিশেষ সুযোগের ওপর।
গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তাই সংকটে পড়া ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের ফেরার একটি বিশেষ আইনি পথ বন্ধ হলো। এখন নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন:







