মঙ্গলবার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩

তিন মাসে ব্যাংকে নতুন কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ৫ হাজার ৭৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:০৩

শেয়ার

তিন মাসে ব্যাংকে নতুন কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ৫ হাজার ৭৭
ছবি সংগৃহীত

চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ ধরনের অ্যাকাউন্ট ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ তিন মাসে নতুন কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে মোট জমা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা।

তিন মাসে ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৩৭ লাখের বেশি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাব ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। তখন এসব হিসাবে জমা ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক খাতে হিসাব বেড়েছে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৩টি। একই সময়ে আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

ব্যক্তি পর্যায়ে কোটিপতি হিসাব বাড়লেও আমানত কমেছে

কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়লেও ব্যক্তি পর্যায়ে আমানত কমেছে। বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা অর্থ বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।

জুন শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তি শ্রেণির হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৯০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা।

মার্চ শেষে ব্যক্তিশ্রেণির এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৪০ হাজার ৬৩০টি। তখন এসব হিসাবে জমা ছিল ৯১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ৭১টি। তবে এসব হিসাবে মোট আমানত কমেছে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যাংকে জমা রাখার প্রবণতা বেড়েছে

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের কোটি টাকার অ্যাকাউন্টের এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তি অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকে জমা থাকছে।

বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার পরিবর্তে অর্থ ধরে রাখছে।

ফলে প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন, ব্যবসায়িক লেনদেনের অর্থ এবং সাময়িকভাবে অব্যবহৃত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণে।

অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি পর্যায়ে সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমেছে। ফলে ব্যক্তি শ্রেণির কোটিপতি অ্যাকাউন্টে আমানত কমলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকে অর্থ রাখার প্রবণতার কারণে সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা অ্যাকাউন্টে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।

কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট মানেই কোটিপতি ব্যক্তি নয়

ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দিয়ে দেশে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি সংস্থারও এ ধরনের হিসাব থাকতে পারে। আবার একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারে। ফলে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা এবং কোটিপতি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ৫ জন। ১৯৭৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৪৭ জন। ১৯৮০ সালে কোটিপতিদের অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি এবং ২০০৮ সালে ১৯ হাজার ১৬৩টিতে উন্নীত হয় কোটিপতি অ্যাকাউন্ট সংখ্যা।

পরবর্তী সময়ে সংখ্যাটি আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এক কোটি টাকার বেশি থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬টি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কোটি টাকার বেশি থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে হয় ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। সবশেষ চলতি বছরের জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি।