মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে কাতার থেকে নিয়মিত এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারকে এখন তুলনামূলক বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে ইয়েমেনকে ঘিরে সংঘাত এবং বাব আল-মান্দেব নৌপথে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সামনে নতুন করে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশীয় উৎপাদন কম, আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে
বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন দেশের চাহিদার তুলনায় কম। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও অন্যান্য খাতের চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা কয়লা ও জ্বালানি তেলের ব্যবহারও রয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস বা কয়লার দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয়ই বাড়ে না, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন যুক্ত হলে স্থানীয় মুদ্রায় জ্বালানি আমদানির ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জাহাজ ভাড়া, জ্বালানি তেলের দামসহ অনেক কিছুতেই বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা রয়েছে জ্বালানি সংকট সমাধানের। তিনি আশা প্রকাশ করেন, হরমুজ প্রণালি বা বাব আল-মান্দেব সাগরপথের সংকট কেটে যাবে।
হরমুজ সংকটে এলএনজি আমদানিতে বাড়তি চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমুদ্রপথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে তেল ও এলএনজি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। পারস্য উপসাগর থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ইরাকসহ প্রধান জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজি এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
বিশেষ করে কাতারের এলএনজি রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ পথে সামরিক সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে এশিয়ার এলএনজি বাজারে দ্রুত সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও পড়ছে। হরমুজ প্রণালির সংকটে কাতার থেকে নিয়মিত এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনামূলক কম দামের এলএনজি না পেয়ে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। এতে একই পরিমাণ গ্যাস আমদানিতেই বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম আরও বেড়ে গেলে বাংলাদেশের ওপর এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
বাব আল-মান্দেবেও বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
অন্যদিকে ইয়েমেনকে ঘিরে সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব চলে যাওয়ায় এ নৌপথ ঘিরে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সৌদির তেল বাণিজ্যও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সরবরাহব্যবস্থাও।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। হুথিদের হামলার আশঙ্কায় এর আগেও বহু আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করেছে।
এতে একটি জাহাজের যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বাড়ে জ্বালানি খরচ, সময়, বীমা প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপের আশঙ্কা
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি তেল, এলএনজি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল জ্বালানি খাতের সংকট নয়; এটি দেশের মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের সামনে অন্তত পাঁচ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, এলএনজির দাম এবং স্পট মার্কেটের অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। তৃতীয়ত, সমুদ্রপথের ঝুঁকির কারণে জাহাজের বীমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। চতুর্থত, জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াবে। পঞ্চমত, আমদানি ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
জ্বালানি সংকটে বিনিয়োগেও প্রভাবের আশঙ্কা
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে। একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের প্রধান জ্বালানি হিসেবে দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভর করা গেলেও এখন চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার সামান্য অস্থিরতাও দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব বিনিয়োগেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা যদি নিশ্চিত না থাকেন যে আগামী দিনে পর্যাপ্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পাওয়া যাবে এবং উৎপাদন ব্যয় কত হবে, তাহলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পে সরবরাহ অনিশ্চিত হলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সরকারের রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল কোনো কোনো মন্ত্রী বক্তব্যে বলেছেন, দুই বছরের আগে গ্যাসের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এই বক্তব্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিকল্প উৎস ও কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর তাগিদ
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কীভাবে কমানো হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি নিশ্চিত করা, একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহ উৎস ও চুক্তির বৈচিত্র্য বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত বাড়ানো জরুরি। স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বৈচিত্র্য আনা এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত জ্বালানি সংগ্রহের বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হলো, জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূ-রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত, একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সামরিক উত্তেজনা কিংবা কোনো বড় উৎপাদক দেশের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু বেশি জ্বালানি আমদানি নয়; বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির অর্থনৈতিক ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৌশলগত মজুদ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুমুখী আমদানি উৎস নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন:







